রাজধানীর রূপনগর থেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে অপহরণ করা ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে নিখোঁজের দীর্ঘ ১৮ দিন পর অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৪)। মঙ্গলবার গাজীপুরের টঙ্গীর একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে তারা শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুয়ারীপাড়ার বাসা থেকে শিশুটিকে কৌশলে তুলে নিয়ে যায় প্রতিবেশী এক নারী। মূলত পুলিশ ও এসআরবির সাঁড়াশি অভিযানের মুখে পাচারকারীরা শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে শিশুটিকে বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর সন্তানকে জীবিত ফিরে পেয়ে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন রিকশাচালক বাবা ও গৃহকর্মী মা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে রূপনগরের দুয়ারীপাড়ার নিজ বাসা থেকে শিশুটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়। ওই দিন সকালে শিশুটির মা জীবিকার তাগিদে গৃহকর্মীর কাজে বাসা থেকে বের হয়ে যান। তখন ঘরের ভেতর শিশুটি তার রিকশাচালক বাবার সঙ্গে বিছানায় ঘুমাচ্ছিল। দুপুর নাগাদ ঘুম থেকে জেগে বাবা দেখেন, তাঁর পাশে ছেলে নেই। ঘরের দরজা খোলা ছিল। আশপাশের অলিগলি ও চেনা সব জায়গায় দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও তিনি সন্তানের কোনো সন্ধান পাননি। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে সেদিনই তিনি রূপনগর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
থানায় মামলা হওয়ার পরপরই শিশুটিকে নিরাপদে উদ্ধারে মাঠে নামে এসআরবি-৪-এর একটি চৌকস দল। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও দুয়ারীপাড়া এলাকার আশপাশের প্রায় ১৫টি সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। ফুটেজে তারা দেখতে পান, বাসা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে স্কয়ার নার্সিং হোম ক্লিনিক এলাকা পর্যন্ত এক ব্যক্তি শিশুটিকে নিয়ে যায়। এরপর নাসরিন ও কুলসুম নামের দুই নারী শিশুটির হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু ওই ক্লিনিকের সামনে পৌঁছানোর পর তাদের আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসআরবি নিশ্চিত হয় যে, ওই শিশুর বাসার পাশের ভাড়াটের মেয়ে নাসরিন দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এই চক্রটি মূলত অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের টার্গেট করে অপহরণ করে এবং বিভিন্ন স্থানে মোটা অঙ্কের টাকা কিংবা প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ ডলারের ($) বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। এই অপরাধে নাসরিনকে সরাসরি সহায়তা করে কুলসুম নামের আরেক নারী। পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান চালিয়ে কুলসুমকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতা নাসরিন কৌশলে পালিয়ে যায়।
গ্রেপ্তার কুলসুমকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানতে পারে, নাসরিন শিশুটিকে ফুসলিয়ে গাজীপুরে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে এক দালালের মাধ্যমে শিশুটিকে বিক্রির শেষ চেষ্টা চলছিল। কিন্তু রূপনগর থানা পুলিশ ও এসআরবির যৌথ তৎপরতায় অপরাধীরা পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া তল্লাশির মুখে পাচারকারীদের প্রায় ৯০% পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। পুলিশ যেকোনো মুহূর্তে তাদের ধরে ফেলবে—এমন আতঙ্কে অপহরণকারীরা গভীর রাতে শিশুটিকে গাজীপুরের নির্জন রাস্তায় একা ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়। এতে নিশ্চিত পাচারের হাত থেকে শিশুটির জীবন রক্ষা পায়।
পরবর্তীতে গাজীপুরের স্থানীয় টহল পুলিশ রাতের আঁধারে রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তবে বয়স মাত্র ছয় বছর হওয়ায় সে নিজের নাম বা বাসার সঠিক ঠিকানা কিছুই বলতে পারছিল না। কোনো কুলকিনারা না পেয়ে পুলিশ শিশুটির সুরক্ষার কথা ভেবে তাকে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার এরশাদ নগরের দত্তপাড়া এলাকার সম্মিলিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের বালক শাখায় পাঠিয়ে দেয়। ১৮ দিন ধরে সে ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রেই অন্য শিশুদের সাথে নিরাপদে আশ্রয় পেয়েছিল। এই সময়ে কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও কর্মীরা তার দেখাশোনা করেন।
অবশেষে মঙ্গলবার এসআরবি-৪ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ওই কেন্দ্রে গিয়ে শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করে এবং তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে তুলে দেয়। এসআরবি জানায়, শিশু পাচার চক্রের পলাতক নাসরিনসহ অন্যদের ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি তারা মা-বাবাদের সতর্ক করে বলেছে, শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের ১০০% সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে আশপাশের ভাড়াটে বা অপরিচিত কারও হাতে সন্তানদের রেখে যাওয়া কখনোই নিরাপদ নয়।















