ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর থানা পুলিশ এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল এক দুঃসাহসিক ও যৌথ অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে আন্তঃবিভাগীয় অজ্ঞান পার্টির ২ জন সক্রিয় ও দুর্ধর্ষ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল। পুলিশের এই সফল অভিযান সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। দীর্ঘ সময়ের গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে পুলিশ এই ২ জন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পেরেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মামলা রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ প্রশাসন। তাদের মধ্যে একজন হলো মাগুরা সদর উপজেলার বোগিয়া গ্রামের হাসেম খানের ছেলে তিলক খান। অপরজন খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার আলকা দামোদর গ্রামের আবুল কালাম হাওলাদারের ছেলে দুলাল হাওলাদার, যাকে অপরাধ জগতে সবাই ‘মলম দুলাল’ নামেই চেনে। পুলিশ জানিয়েছে, এই দুই ব্যক্তি দীর্ঘ দিন ধরে একটি বড় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে বাসে বা ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের টার্গেট করে তারা নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে দিত এবং তাদের কাছে থাকা সব কিছু ছিনিয়ে নিত।
পুলিশ এই অভিযানটি পরিচালনা করার জন্য দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা ধরে কাজ করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে, এই চক্রের সদস্যরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে। এরপর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে পুলিশের একটি চৌকস দল গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানা এলাকায় এবং মাগুরা জেলার সদর থানা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায়। অভিযানে ১০০% সফলতার সাথে এই দুই অপরাধীকে আটক করা সম্ভব হয়। তাদের গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও উদ্ধার করেছে, যা এই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতে সাহায্য করবে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। তারা মূলত যাত্রীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে কৌশলে বিস্কুট, জুস বা পানির সাথে উচ্চমাত্রার নেশাজাতীয় ওষুধ মিশিয়ে দিত। এই ওষুধ খাওয়ার মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে ভুক্তভোগী ব্যক্তি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। এরপর তারা ভুক্তভোগীর মোবাইল, নগদ টাকা এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করত। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি গত কয়েক বছরে কয়েক শত মানুষের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা ও দামী মালামাল লুটে নিয়েছে। তাদের কাজের ধরন এতটাই নিখুঁত ছিল যে, সাধারণ মানুষ সহজে তাদের সন্দেহ করতে পারত না।
গ্রেপ্তারকৃত তিলক খান ও মলম দুলালের অপরাধের রেকর্ড বেশ দীর্ঘ। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে চুরি ও ছিনতাইয়ের একাধিক মামলা ঝুলে আছে। এর আগে তারা কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই পেশায় জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, তারা কোনো সাধারণ চোর নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্রের অংশ। এবার তাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে পুলিশ সেই সিন্ডিকেটের মূলে আঘাত করতে পেরেছে। পুলিশ আশা করছে, এই দুই জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং লুটে নেওয়া মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
কোটচাঁদপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা অপরাধ দমনে সর্বদা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। বিশেষ করে এই ধরনের অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির উপদ্রব কমাতে তারা নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, উৎসবের মৌসুমে বা যাত্রাপথে সাধারণ মানুষকে ১০০% সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত কোনো ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার জন্য তারা বারবার অনুরোধ জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ভবিষ্যতে আরও কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের এই সফল অভিযানে সাধারণ নাগরিকরা খুবই খুশি। তারা মনে করছেন, এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চললে অপরাধীদের মনে ভয় সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বাড়বে। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ এই অভিযানের সফলতাকে তাদের পেশাদারিত্বের এক বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছে। আগামী দিনেও জেলা জুড়ে এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
















