মন্ত্রিসভা এখন ৫১ সদস্যের: দপ্তর বণ্টন ও ভারসাম্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় নতুন ৫ জন সদস্য যুক্ত হওয়া এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর পদোন্নতির পর এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর বাইরে ১০ জন উপদেষ্টা এবং ৩ জন বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিশাল বহরের প্রশাসনে দপ্তর বণ্টনের ভারসাম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো মন্ত্রণালয়ে কাজের পরিধি কম হলেও সেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভিড়; আবার কোথাও একজন মন্ত্রী একাই ৩টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেয়। শুরুতে মন্ত্রিসভার আকার কিছুটা ছোট থাকলেও কয়েক দফায় তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ রদবদলের পর দেখা যাচ্ছে, ৫টি মন্ত্রণালয়ে একাধারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২টি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি বিশেষ সহকারীও রয়েছেন। এই ভারসাম্যহীন বণ্টন নিয়ে খোদ রাজনৈতিক মহলেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একই সঙ্গে ২ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সবাইকে অবাক করেছে। সাধারণত একটি মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী থাকলেও, দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকার ঘটনা বেশ বিরল।

মন্ত্রণালয়গুলোর ভেতরে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত চিত্র। যেমন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয় একাই সামলাচ্ছেন, তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন জোনায়েদ সাকি। আবার এই দুই মন্ত্রণালয়ের জন্যই উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অন্যদিকে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আন্দালিব রহমান পার্থ। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন ইয়াসের খান চৌধুরী এবং উপদেষ্টা হিসেবে আছেন জাহেদ উর রহমান। জাহেদ উর রহমান আবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও উপদেষ্টা। এভাবে কিছু মন্ত্রণালয়ে পদের ছড়াছড়ি থাকলেও অনেক জায়গায় কাজের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন মন্ত্রীরা।

সবচেয়ে বেশি কাজের চাপে আছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং শেখ রবিউল আলম। খন্দকার আবদুল মুক্তাদির একাই শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য—এই ৩টি বড় মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। এর মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তাঁর কোনো প্রতিমন্ত্রী নেই। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে আছেন রুহুল কবির রিজভী। একইভাবে শেখ রবিউল আলম সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এই ৩টি বিশাল দপ্তরের জন্য তাঁর অধীনে মাত্র ২ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদের মতো প্রভাবশালী নেতা আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর একাই সামলাচ্ছেন, সেখানে কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা নেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে আছেন খলিলুর রহমান। দীর্ঘ সময় এখানে হুমায়ুন কবির উপদেষ্টা হিসেবে থাকলেও তাকে এখন পূর্ণাঙ্গ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগে থেকেই এই মন্ত্রণালয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফলে একই মন্ত্রণালয়ে এখন ২ জন প্রতিমন্ত্রী কাজ করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে একে কাজের গতি বাড়ানোর কৌশল বলা হলেও, প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি উপদেষ্টাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

মন্ত্রিসভার এই নতুন বিন্যাসে কিছু রদবদলও চোখে পড়ার মতো। যেমন, আফরোজা খানমকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আগে প্রতিমন্ত্রী থাকা এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পদোন্নতি দিয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে মো. মিজানুর রহমান মিনু এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন দায়িত্ব পালন করছেন। তবে হেলাল উদ্দীন একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়েরও প্রতিমন্ত্রী। ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফকির মাহবুব আনাম।

প্রশাসনিক এই বিশাল কাঠামোতে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত আছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কোনো পূর্ণ মন্ত্রী নেই, সেখানে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন মো. আব্দুল বারী এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। এই বিপুল সংখ্যক মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভিড়ে কাজের সমন্বয় কতটা হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, দপ্তর বণ্টনে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও আঞ্চলিক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৫১ সদস্যের এই বড় মন্ত্রিসভা জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ