ময়মনসিংহ শহরকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করার স্বপ্নে ২০ আগস্ট সকালে রাজপথে নেমেছিল একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। ‘যেখানে আমি, সেখানেই পরিচ্ছন্নতা’ এই চমৎকার আর শক্তিশালী স্লোগানকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ স্কাউটস এক বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ডাক দেয়। বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ যখন আমাদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। সকাল ১০টার দিকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আয়োজনে শুরু হওয়া এই অভিযানে স্কাউটদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। শহর পরিষ্কার রাখা কেবল সিটি কর্পোরেশন বা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি যে প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য, এই সত্যটিই আজ আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়া হলো।
এই মহতী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক এবং বাংলাদেশ স্কাউটস জেলা শাখার সভাপতি মো. সাইফুর রহমান। তিনি নিজের হাতে ময়লা পরিষ্কারের মাধ্যমে কর্মসূচির শুভ সূচনা করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ উপস্থিতি ছিল ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আরিফুল ইসলামের, যিনি পুরো কার্যক্রমটির সভাপতিত্ব করেন। জেলা স্কাউট ভবন থেকে শুরু করে এইচএসটিটিআই এলাকা, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল এবং সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এলাকা পর্যন্ত এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। পথে পথে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করতে করতে ছাত্র-ছাত্রীরা এগিয়ে যায়। তাদের এই তৎপরতা দেখে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ পথচারীরাও উৎসাহিত হন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন যা সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, “স্কাউটরা সবসময় দেশের সেবায় নিবেদিত। আমরা যেমন নিজেদের ঘরবাড়ি ঝকঝকে তকতকে রাখি, ঠিক সেভাবেই আমাদের প্রিয় দেশকেও নিজেদের বড় ঘর মনে করতে হবে।” তিনি পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যকে আমাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন। বর্তমানে আমাদের চারপাশের পরিবেশের অন্তত ৬০% দূষণের পেছনে রয়েছে যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক। জেলা প্রশাসক আরও বলেন যে, পলিথিনমুক্ত দেশ গড়তে না পারলে ভবিষ্যতে আমাদের বড় মাশুল গুনতে হবে। পলিথিন কেবল মাটি নষ্ট করছে না, বরং বৃষ্টির সময় ড্রেনেজ ব্যবস্থায় অন্তত ৮০% জট সৃষ্টি করছে, যার ফলে শহরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ($) বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করা না যায়, তবে এই ক্ষতির পরিমাণ উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা আমাদের বার্ষিক জিডিপির প্রায় ১.৫% সাশ্রয় করতে পারি। ময়মনসিংহে আয়োজিত আজকের এই ছোট্ট পদক্ষেপ যদি প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে আমাদের আবর্জনা পরিষ্কারের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে না। স্কাউটরা আজ যেভাবে দলবেঁধে রাজপথে নেমেছে, তা যদি আমাদের দেশের মোট যুবশক্তির অন্তত ২০% অনুসরণ করে, তবে খুব দ্রুতই আমাদের দেশ বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন দেশে পরিণত হবে।
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা কেবল রাস্তা পরিষ্কার করছেন না, তারা মানুষের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেটও বিতরণ করছেন। বিশেষ করে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এলাকায় যখন অভিযানটি পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকও এতে যোগ দেন। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং পলিথিন ব্যাগগুলোকে আলাদা করে ডাস্টবিনে ফেলার মাধ্যমে একটি সুন্দর নজির স্থাপন করা হয়। বর্তমানে শহরগুলোতে যে পরিমাণ আবর্জনা উৎপাদিত হয়, তার মাত্র ৪০% থেকে ৫০% সঠিক জায়গায় পৌঁছায়। বাকি অংশ ড্রেন বা জলাশয়ে গিয়ে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করে। আজকের অভিযানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিজ্ঞা করেন যে, তারা এখন থেকে বাড়ির বাইরে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং অন্যদেরও এটি করতে উৎসাহিত করবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আরিফুল ইসলাম সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ময়মনসিংহের এই অভিযান কেবল একদিনের জন্য নয়, বরং এটি একটি আন্দোলনের সূচনা। তিনি জানান, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও পর্যায়ক্রমে এই সচেতনতা বাড়ানো হবে। সরকার বর্তমানে পরিবেশ সুরক্ষায় কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে, কিন্তু জনসচেতনতা ছাড়া এই অর্থ কাজে আসবে না। সাধারণ মানুষের সহায়তা পেলে ময়মনসিংহকে ১০০% পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এই অভিযানে স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০০ জন স্কাউট এবং স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। তারা ময়মনসিংহের প্রধান প্রধান সড়কের দুই পাশের ময়লা সরিয়ে এক পরিপাটি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষকরা বলেন, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানোও জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজে রাস্তা ঝাড়ু দেয়, তখন সে কখনোই আর রাস্তায় ময়লা ফেলার কথা ভাববে না। এই চর্চাটি শৈশব থেকেই শুরু করা উচিত। ময়মনসিংহের এই উদ্যোগ দেখে শহরের ব্যবসায়ীরাও নিজেদের দোকানের সামনের জায়গা পরিষ্কার রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবও অন্তত ৩০% কমানো সম্ভব বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই এই অভিযান কেবল শহর সাজানো নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
সব শেষে স্কাউটরা একটি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শেষ করেন। তাদের এই নীরব বিপ্লব প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সদিচ্ছা থাকলে খুব সহজেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। ময়মনসিংহের আকাশ-বাতাস যেন আজ সেই পরিবর্তনের গান গাইছে। দিনশেষে এই বার্তাটিই ছড়িয়ে পড়েছে যে—আমার ময়লা ফেলার জায়গা ডাস্টবিন, রাস্তা নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামনে এ ধরনের আরও বড় বড় সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে যাতে ময়মনসিংহের হারানো সৌন্দর্য পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায়। আজকের এই সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহবাসী এক নতুন ও নির্মল ভোরের স্বপ্ন দেখছে।
















