চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির বড় সাফল্য: ধাওয়া খেয়ে ১৯৬ বোতল মাদক ফেলে পালালো চোরাকারবারিরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবি আবারও তাদের সক্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) এক ঝটিকা অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক উদ্ধার করেছে। চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবির যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, তারই অংশ হিসেবে এই অভিযানটি পরিচালিত হয়। বিজিবি সদস্যরা সোনামসজিদ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকা মাদকের বড় একটি চালান জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে রাতের অন্ধকারে ঘন কুয়াশা ও প্রতিকূল পরিবেশের সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় এই অভিযানে কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি।

বিজিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের এই অভিযানে বিজিবি সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাজ করে। মহানন্দা ব্যাটালিয়নের সোনামসজিদ বিওপির একটি বিশেষ টহল দল আগে থেকেই সীমান্তের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে ওত পেতে ছিল। সীমান্ত পিলার ১৮৫/১-এস থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে শাহবাজপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের একটি মৎস্য হ্যাচারি এলাকায় এই অভিযান চলে। বিজিবির টহল দল যখন চোরাকারবারিদের চ্যালেঞ্জ করে, তখন তারা তাদের সাথে থাকা বস্তা ও মালামাল ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্যরা তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৯৬ বোতল ভারতীয় এসকাফ (Eskuf) সিরাপ জব্দ করে।

এই এসকাফ সিরাপ বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি ভয়ানক নেশাদ্রব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই মাদকের এক একটি বোতলের বাজারমূল্য বাংলাদেশে অনেক বেশি। বিজিবি কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, এই ১৯৬ বোতল মাদকের বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ($) দাম বাড়ার সাথে সাথে এ ধরনের মাদকের দামও আগের চেয়ে প্রায় ১০% থেকে ১৫% বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চোরাকারবারিরা মূলত অবৈধ পথে অল্প পরিশ্রমে বেশি মুনাফা করার আশায় সীমান্ত পার হয়ে এসব নিষিদ্ধ পণ্য নিয়ে আসে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করে।

৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমকে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজ ও আগামী প্রজন্মকে মাদকের ভয়ানক থাবা থেকে রক্ষা করাই বিজিবির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন অপরাধের প্রায় ৩০% কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িত, যা সমাজের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত। তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনোভাবেই চোরাকারবারিদের ছাড় দেব না। বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি মেনে সীমান্তে কঠোর পাহারার ব্যবস্থা করেছে।” এই সফল অভিযানের ফলে ওই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে বর্তমানে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সোনামসজিদ এলাকাটি বরাবরই চোরাকারবারিদের নজরে থাকে। তবে বিজিবি দাবি করছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে টহল ব্যবস্থার শক্তি অন্তত ২০% থেকে ৪০% বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং ড্রোনের মাধ্যমেও অনেক জায়গায় নজরদারি করা হচ্ছে। তবে ভৌগোলিক কারণে কিছু জায়গায় রাত ১২টার পর টহল দেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। তবুও বিজিবি জওয়ানরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনরাত সীমান্ত পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন। জব্দকৃত ১৯৬ বোতল মাদক এখন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংসের অপেক্ষায় থানায় জমা দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমান্তে মাদকের এই আনাগোনা সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবনকেও বাধাগ্রস্ত করে। মাদকাসক্তদের উপদ্রবে এলাকায় ছোটখাটো চুরির ঘটনা ১০% থেকে ১৫% বেড়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিজিবির এই ধরনের অভিযান যদি নিয়মিতভাবে আরও জোরালো করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ অনেক শান্তিতে থাকতে পারবে। বিশেষ করে বর্ডার এলাকার তরুণরা যাতে এসব মরণনেশায় জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য বিজিবির এই তৎপরতা প্রশংসার দাবি রাখে। পুলিশ ও বিজিবি যদি ১০০% সমন্বয় করে কাজ করে, তবে মাদকের এই সরবরাহ লাইন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

বিজিবি কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে যাতে সীমান্ত অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যায়। মহানন্দা ব্যাটালিয়নের এই সাফল্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। জব্দকৃত মাদকের বিষয়ে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, পালিয়ে যাওয়া চোরাকারবারিদের শনাক্ত করার জোর চেষ্টা চলছে। তাদের পেছনে গডফাদার হিসেবে কারা বিনিয়োগ করছে, সেটি বের করতে বিজিবির গোয়েন্দা শাখা কাজ শুরু করেছে। দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির এমন কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সবশেষে বলা যায়, মাদকের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কেবল বিজিবি নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সীমান্তে বিজিবির যে প্রহরা, তাতে সাধারণ মানুষ যদি চোখ-কান খোলা রেখে চোরাচালানীদের তথ্য দেয়, তবে অপরাধীদের পালানোর কোনো পথ থাকবে না। শিবগঞ্জের সোনাপুর গ্রামের এই উদ্ধার অভিযান আবারও প্রমাণ করল যে, অপরাধীরা যতই চতুর হোক না কেন, বিজিবির তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে পার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সরকারের মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য, তাতে ৫৯ বিজিবির এই অবদান ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

সম্পর্কিত নিবন্ধ