শুক্রবার সন্ধ্যায় এক আনন্দঘন পরিবেশে বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৪ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২ জন প্রতিমন্ত্রীকে শপথবাক্য পাঠ করান। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রদবদল ও নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং এরপর পর্যায়ক্রমে নতুন মন্ত্রীদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এই নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে, যা দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন চার মন্ত্রীর মধ্যে ড. আবদুল মঈন খান, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাচিং প্রু জেরী ও আন্দালিভ রহমান পার্থর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এদের মধ্যে রশিদুজ্জামান মিল্লাত আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, যা এখন পূর্ণ মন্ত্রিত্বে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে টেকনোক্র্যাট কোটায় হুমায়ুন কবির এবং তরুণ রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দ্রুতই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যেখানে কার অধীনে কোন মন্ত্রণালয় থাকবে তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ায় তার আগের পদ অর্থাৎ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদটি খালি হয়। সেই গুরুত্বপূর্ণ পদে এখন থেকে দায়িত্ব পালন করবেন অভিজ্ঞ নেতা ড. আবদুল মঈন খান। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ২৫% বরাদ্দ থাকে, যার মাধ্যমে সারা দেশের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলে। নতুন মন্ত্রী হিসেবে মঈন খানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই বিশাল বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে উন্নয়নের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণের প্রকল্পের তদারকি এখন তার হাতে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এখন থেকে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পাবেন। এর আগে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আফরোজা খানম রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। বিমান চলাচল খাতে যাত্রী সেবার মান বাড়ানো এবং পর্যটন শিল্প থেকে আয় অন্তত ১৫% বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবেন নতুন মন্ত্রী। পর্যটন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বর্তমানে মোট জিডিপির মাত্র ২.৫%, যা আগামী কয়েক বছরে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রশিদুজ্জামান মিল্লাত তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই খাতকে আরও লাভজনক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী এখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাবেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই মন্ত্রণালয়ে অনেক নাটকীয়তা দেখা গেছে। এর আগে দীপেন দেওয়ান মন্ত্রী হয়েও পদত্যাগ করেছিলেন এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাচিং প্রু জেরীর নিয়োগের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন জোয়ার আসবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। ওই অঞ্চলের কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে বর্তমানে ১০% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নে নতুন মন্ত্রীর ভূমিকা হবে অপরিসীম।
তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম ছিল বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থর। তিনি এখন থেকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে এই পদে জহির উদ্দিন স্বপন দায়িত্ব পালন করছিলেন, যাকে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় পার্থর দায়িত্ব পাওয়ার পর তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমানে ডিজিটাল প্রচারণার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার কাজ এখন পার্থর নেতৃত্বে চলবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে আছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ হজে যান, যার ব্যবস্থাপনা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। বর্তমানে হজের খরচ প্রায় ১০% কমানোর একটি প্রস্তাবনা সরকারের টেবিলে রয়েছে, যা নিয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রীকে গুরুত্বের সাথে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিয়েছেন হুমায়ুন কবির। আগে থেকেই এই মন্ত্রণালয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন এবং মন্ত্রী খলিলুর রহমানও বহাল আছেন। অর্থাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন থেকে দুইজন প্রতিমন্ত্রী কাজ করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুইজন প্রতিমন্ত্রী রাখার সিদ্ধান্তকে কৌশলগত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের রপ্তানি আয় বর্তমানে বার্ষিক ১২% হারে বাড়ছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন নতুন দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী বছর নাগাদ বিদেশি বিনিয়োগ বা FDI এর পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। হুমায়ুন কবিরের মতো অভিজ্ঞ কূটনৈতিক ব্যক্তিকে টেকনোক্র্যাট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। সব মিলিয়ে নতুন এই মন্ত্রিসভা দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কতটুকু সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
















