ঝিনাইদহ শহরে মেসের সামান্য বাজার আর খাবার নিয়ে ঝগড়া এখন একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিলো। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শহরের মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত কাওসার (২১) ছিলেন ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সপ্তম সেমিস্টারের একজন মেধাবী ছাত্র। তাঁর রুমমেট লিখন খাঁ (১৬)-র ছুরিকাঘাতে মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। তুচ্ছ একটি ঘটনা কীভাবে খুনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তা দেখে পুরো শহরবাসী এখন স্তব্ধ হয়ে আছে।
নিহত কাওসার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চটকাবাড়িয়া গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত লিখন খাঁ সদর উপজেলার বাড়িবাথান দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্র। সে গান্না ইউনিয়নের শৈলমারি গ্রামের লিটু খাঁর ছেলে। তারা ৬ থেকে ৭ জন শিক্ষার্থী মিলে ওই মেসটিতে ভাড়া থাকতেন এবং নিজেরা মিলেমিশে রান্না করে খাবার খেতেন। মাসের খরচ সামলাতে তারা নিজেরাই পালাক্রমে বাজার ও হিসাবের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এই অতি সাধারণ হিসাব মেলাতে গিয়েই কাওসারকে আজ না ফেরার দেশে চলে যেতে হলো।
মেসের অন্য সদস্যদের থেকে জানা গেছে, ঝামেলার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার দুপুরে। দুপুরের খাবার কম হওয়া নিয়ে কাওসার ও লিখনের মধ্যে প্রথম কথা-কাটাকাটি হয়। তখন অন্য রুমমেটরা বিষয়টি মিটমাট করে দিলেও দুজনের মনে ক্ষোভ ছিল ১০০%। সন্ধ্যায় মেসের সাপ্তাহিক বাজার ও কেনাকাটার হিসাব নিয়ে তাদের মধ্যে আবার তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। এই তুচ্ছ ঘটনা থেকেই দুজনের মধ্যে তর্কের পারদ দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে এবং একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তর্কের চরম পর্যায়ে কিশোর লিখন নিজের রাগ সামলাতে পারেনি। সে মেসের ভেতরে থাকা একটি ধারালো সবজি কাটার ছুরি দিয়ে সরাসরি কাওসারের ঘাড়ে সজোরে আঘাত করে। ছুরির আঘাতে কাওসারের ঘাড়ের রগ কেটে যায় এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। রক্তাক্ত অবস্থায় কাওসার তৎক্ষণাৎ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। মেসের অন্য শিক্ষার্থীরা এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে চিৎকার শুরু করেন এবং দ্রুত কাওসারকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন।
মুর্মূষু অবস্থায় সহপাঠীরা কাওসারকে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাহিদ এমরান তন্নী বলেন, কাওসারের ঘাড়ে অত্যন্ত গভীর ক্ষত ছিল এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি ১০০% মারা গিয়েছিলেন বলে চিকিৎসক নিশ্চিত করেন। এরপর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
খবর পেয়ে ঝিনাইদহ সদর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং অভিযান শুরু করে। পুলিশ পালিয়ে যাওয়ার আগেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিসহ ঘাতক লিখন খাঁকে হাতেনাতে আটক করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিখন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। এই ঘটনার পর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহত কাওসারের সহপাঠীরা হাসপাতালে ভিড় করেন এবং এই নৃশংস হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, মেসের তুচ্ছ কেনাকাটা ও বাজার নিয়ে বিরোধের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ খবর পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং অভিযুক্ত লিখনকে আটক করেছে। বর্তমানে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। সামান্য বাজার করা নিয়ে এমন নৃশংসতা সত্যিই সমাজ ও পরিবারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে এখন শুধুই মাতম চলছে।
যে ছেলেটি সপ্তম সেমিস্টারের পড়াশোনা শেষ করে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, সেই কাওসারের জীবন প্রদীপ নিভে গেল সামান্য কিছু টাকার বাজারের হিসাব নিয়ে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা বা ধৈর্য কমে যাওয়া একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের তুচ্ছ ঘটনায় জীবন চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ ও প্রশাসন এখন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার কাজ করছে।
















