ঝিনাইদহের মাঠগুলোতে এখন সবুজের সমারোহ। চারিদিকে আমন ধানের ঢেউ খেলছে। বছরের এই সময়টাতে গ্রামীণ জনপদে কৃষকদের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। এই অবসর সময়টাকে আনন্দময় করে তুলতে ঝিনাইদহে আয়োজন করা হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী ফুটবল প্রতিযোগিতার। মাঠে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমী কৃষকরা লাঙল-জোয়াল ছেড়ে বল নিয়ে মাঠে নামলেন। এই ফুটবল ম্যাচ ঘিরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় বইছিল সাজসাজ রব। কৃষকদের এমন উন্মাদনা দেখে মনে হচ্ছিল কোনো পেশাদার লিগের খেলা চলছে।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইব্রাহিম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এই প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি কৃষি উপকরণ প্রতিষ্ঠান সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নেয়। খেলায় স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকরা দুটি দলে ভাগ হয়ে লড়াই করেন। মাঠের লড়াই শুরুর আগে খেলোয়াড়দের মাঝে ১০০% নতুন জার্সি এবং খেলা শেষে উন্নত মানের খাবার বিতরণ করা হয়। পুরো আয়োজনে কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কেবল খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, হাজার হাজার কৃষক এই আয়োজন উপভোগ করতে মাঠে জড়ো হয়েছিলেন।
প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল বিষয়খালী ‘এমিষ্টার টপ কৃষক একাদশ’ এবং ‘নলডাঙ্গা ইনসিপিয়ো কৃষক একাদশ’। টানটান উত্তেজনার এই ম্যাচে দুই দলই শুরু থেকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। তবে শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় নলডাঙ্গা ইনসিপিয়ো কৃষক একাদশ। সাধারণ ফুটবলের মতো পেশাদারিত্ব না থাকলেও কৃষকদের ড্রিবলিং আর গোল করার চেষ্টা দর্শকদের কয়েক গুণ বেশি আনন্দ দিয়েছে। গ্রামবাসী মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে নিজেদের প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন। মাঠের পরিবেশ হয়ে উঠেছিল আনন্দমুখর।
এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের সাউথ জোনের জেডএসএম কামরুল হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে কৃষকদের সাহস জোগাতে আসেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জলি খাতুন ও লালন মিয়া। এছাড়াও কুষ্টিয়া ডিভিশনের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার ইশতিয়াক শাহরিয়ার এবং কোটচাঁদপুর এরিয়া সেলস ম্যানেজার আল-মুজাহিদ মৃদুলসহ স্থানীয় কৃষি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অতিথিরা খেলা শেষে বিজয়ী ও রানার্সআপ দলের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কার পেয়ে কৃষকদের মুখে চওড়া হাসি ফুটে ওঠে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কামরুল হাসান বলেন, “আমাদের দেশের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী অথচ তাঁরাই অনেক সময় বিনোদন থেকে অবহেলিত থাকেন। তাদের বিনোদনের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং কাজের একঘেয়েমি কাটাতে আমাদের এই আয়োজন। আমরা চাই কৃষকরা সুস্থ থাকলেই দেশের কৃষি উন্নয়ন ১০০% ত্বরান্বিত হবে।” তিনি আরও জানান, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সিনজেনটার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কৃষকদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে সামনে আরও বড় আয়োজন করবে।
খেলা দেখতে আসা স্থানীয় এক কৃষক রহিম আলী বলেন, “সারাদিন মাঠে রোদে পুড়ে কাজ করি। বল নিয়ে নিজেরা মাঠে নামার সুযোগ হবে কখনও ভাবিনি। নতুন জার্সি আর সবার সামনে খেলতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই কয়েকটা ঘণ্টা আমরা সংসারের সব চিন্তা আর হাড়ভাঙা খাটুনির কথা ভুলে গিয়েছিলাম।” কেবল ফুটবল খেলাই নয়, এই অনুষ্ঠানটি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং ভ্রাতৃত্ব বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। গ্রামীণ জনপদে এমন সুস্থ বিনোদন সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।
এই ফুটবল ম্যাচ উপলক্ষে এলাকার মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। কেবল কৃষক নন, এলাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পেশাজীবীরাও খেলা উপভোগ করতে মাঠে জড়ো হন। সিনজেনটার কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা কৃষকদের কেবল উন্নত বীজ বা সার দিয়েই সাহায্য করতে চান না, বরং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও সামাজিক দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতে কৃষকদের মধ্যে কোম্পানির প্রতি আস্থা অনেক বেড়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া উচিত বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
পরিশেষে, ঝিনাইদহের এই ব্যতিক্রমী ফুটবল ম্যাচটি প্রমাণ করেছে যে গ্রামীণ জীবনে ছোট ছোট আনন্দগুলোও মানুষের মনে বড় প্রভাব ফেলে। খেলার শেষে সবাই মিলে উন্নত মানের খাবার খেয়ে খুশি মনে বাড়ি ফেরেন। প্রান্তিক কৃষকদের মুখে হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টা এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষকরাই প্রাণশক্তি, আর তাদের জন্য এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
















