এআই দিয়ে চিকিৎসকের কণ্ঠ নকল করে ভুয়া ওষুধ বিক্রি: চট্টগ্রামে ২ প্রতারক গ্রেপ্তার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের প্রখ্যাত ইউরোলজিস্ট ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের ছবি ও কণ্ঠস্বর নকল করে প্রতারণার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই চক্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসকের হুবহু কণ্ঠ তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচার করছিল। গত মঙ্গলবার ও বুধবার চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামি ও পাঁচলাইশ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ।

গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবক হলেন ২৩ বছর বয়সী তানভীর আলম ওরফে রাহাত এবং একই বয়সের মো. নুর নবী ইসলাম ওরফে মানিক। পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৩টি আধুনিক স্মার্টফোন, ৪টি সচল সিম কার্ড এবং ৭ ধরনের ভুয়া ভেষজ ফুড সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ উদ্ধার করেছে। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রটি দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। জনপ্রিয় চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করায় মানুষ খুব সহজেই তাঁদের ফাঁদে পা দিচ্ছিল।

পুলিশ জানায়, এই প্রতারক চক্রটি প্রথমে ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধ্যাপক কামরুল ইসলামের নাম ও ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া পেজ খোলে। এরপর এআই বা ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে ওই চিকিৎসকের কণ্ঠস্বর একদম হুবহু নকল করে বিভিন্ন ভিডিও তৈরি করে। ভিডিওগুলোতে দেখানো হতো যে, ডাক্তার নিজেই কোনো নির্দিষ্ট ভেষজ ওষুধের গুণগান করছেন। বিশেষ করে প্রোস্টেট সমস্যা, শারীরিক ও যৌন দুর্বলতা এবং কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো।

সাধারণ রোগীরা যখন অনলাইনে এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেখতেন, তাঁরা মনে করতেন অধ্যাপক কামরুল ইসলাম সত্যিই এসব ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। চিকিৎসকের ওপর মানুষের অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে চক্রটি অর্ডার নিত এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নিচুমানের বা ক্ষতিকর ভেষজ পণ্য সরবরাহ করত। এতে মানুষ কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং ভুল ওষুধ সেবনের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও পড়ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা অনুমোদন ছিল না।

অধ্যাপক কামরুল ইসলাম যখন এই জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারেন, তখন তিনি দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন তিনি। এই মামলার সূত্র ধরেই ডিবির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন দল তদন্তে নামে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে পুলিশ চট্টগ্রামে অবস্থানরত এই চক্রের সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে চট্টগ্রামের দুটি এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাঁদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিঞ্চার নিয়াজ মেহেদী জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক দলের সক্রিয় সদস্য। তাঁরা প্রযুক্তিতে বেশ দক্ষ এবং এই দক্ষতাকে খারাপ কাজে ব্যবহার করছিলেন। জনপ্রিয় ব্যক্তিদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে ঠকানোই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেন, এই চক্রের সাথে আরও কারা জড়িত আছে এবং তারা আর কোন কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করেছে, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশ সাধারণ মানুষকে অনলাইন থেকে ওষুধ কেনার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। ডিবি বলেছে, ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন বা এআই দিয়ে বানানো ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। যেকোনো স্বাস্থ্যপণ্য বা ওষুধ কেনার আগে সেটি রেজিস্টার্ড কি না এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কোনো অনুমোদন আছে কি না, তা সরাসরি যাচাই করতে হবে। শুধু অপরিচিত কোনো পেজের কথায় বিশ্বাস করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। কোনো নাগরিক এমন প্রতারণার শিকার হলে দেরি না করে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বর্তমানে গ্রেপ্তার ওই দুই যুবকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা অপরাধের কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সাইবার পুলিশ এখন থেকে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করবে বলেও জানানো হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ