দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে কিশোরী অপহরণ ও ধর্ষণ: পুলিশের সাহসী অভিযানে মূল হোতা রাসেল গ্রেফতার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সুমন খান, কেরানীগঞ্জ:

রাজধানীর উপকণ্ঠ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অপহরণ ও আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মো. রাসেল ওরফে হাসান (২৪) নামের ওই যুবককে ধরতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক তৎপরতা চালায়। অবশেষে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল বিশেষ অভিযান চালিয়ে রাসেলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভুক্তভোগী পরিবারসহ এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপ অপরাধীদের জন্য একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে। এলাকার প্রায় ৯৫% মানুষই পুলিশের এই লড়াকু ভূমিকার প্রশংসা করছেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। ভুক্তভোগী কিশোরীটি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি দর্জির দোকানে কাজ করত। দরিদ্র পরিবারের মেয়েটি সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে কিছুটা আর্থিক সাহায্য করত। প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় ওত পেতে ছিল রাসেল ও তার সহযোগীরা। মেয়েটি নির্জন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রাসেলসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জন তাকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। কিশোরীটির মুখ চেপে ধরায় সে চিৎকার করারও সুযোগ পায়নি। অপহরণের পর তাকে সরাসরি ঢাকার বাইরে বাগেরহাট জেলার যাত্রাপুর এলাকায় রাসেলের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মেয়েটি নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তারা আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও মেয়ের কোনো সন্ধান পাননি। পরবর্তীতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে, মেয়েটিকে বাগেরহাটে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর স্থানীয় লোকজনের সাহসিকতা ও সহযোগিতায় কিশোরীকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর কিশোরীটি তার ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকরা ধর্ষণের আলামত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এই নৃশংস ঘটনায় কিশোরীর বাবা মো. আমির হোসেন হাওলাদার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জিয়াউর রহমান অপরাধীর অবস্থান শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেন। পুলিশ জানায়, আসামি রাসেল অত্যন্ত চতুর হওয়ায় বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিল। তবে পুলিশের ১০০% আন্তরিক প্রচেষ্টার কাছে শেষ পর্যন্ত সে হার মানে। রাসেলের গ্রেফতারের সংবাদটি কেরানীগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে এক বিরাট স্বস্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, এই সাহসিকতাপূর্ণ অভিযানের ফলে অপরাধীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করতে ভয় পাবে।

কিশোরীর বাবার দাবি, রাসেল একা এই কাজ করেনি। তার সাথে থাকা ২-৩ জন সহযোগীও সমানভাবে অপরাধী। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় না আনলে এই বিচার পূর্ণতা পাবে না। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, “আমার মেয়েটার জীবন যারা নষ্ট করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।” মামলার প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দরিদ্র এই পরিবারটিকে প্রায় ১,৫০০থেকে২,০০০ডলার সমমূল্যের আইনি ব্যয়ের দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের জন্য অনেক বড় বোঝা। তবুও তারা ন্যাবিচারের আশায় বুক বেঁধেছেন। সমাজসেবীরা মনে করেন, এ ধরনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কঠোর অবস্থান অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করতে ৯০% ভূমিকা রাখে।

পুলিশের তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, অপহরণের পর কিশোরীটিকে কোথায় কোথায় রাখা হয়েছিল এবং কারা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। এসআই জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, তারা ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী চার্জশিট তৈরির কাজ করছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্ত চলাকালীন সময়ে যেন কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটানো না হয়, সে ব্যাপারেও পুলিশ সতর্ক রয়েছে। তারা মনে করেন, বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে এই মামলার রহস্য ১০০% উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সুশীল সমাজ মনে করে, বর্তমান সময়ে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দর্জির দোকানের মতো কর্মস্থলে কাজ করতে গিয়েও যদি কিশোরীরা নিরাপদ না থাকে, তবে তা সমাজের জন্য লজ্জাজনক। সচেতন নাগরিকরা দাবি জানিয়েছেন, শুধু গ্রেফতার নয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করতে হবে। তারা আরও বলছেন, রাসেলের মতো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সমাজে নারী নির্যাতনের হার অন্তত ৫০% কমিয়ে আনা সম্ভব। পুলিশের এই সফল অভিযানকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে এমন তৎপরতা দেখানোর দাবি সাধারণ মানুষের।

সবশেষে, রাসেলের গ্রেফতার হওয়ার পর ভুক্তভোগী কিশোরীটি এখন বাড়িতে থাকলেও সে প্রচণ্ড মানসিক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তার সুন্দর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। তবে পুলিশের এই ত্বরিত পদক্ষেপ তাকে কিছুটা হলেও সাহস জুগিয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা, আদালত রাসেলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করবে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে যে, কিশোরীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তারা শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠানোই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।

সম্পর্কিত নিবন্ধ