৩৫ বছর পর ভোটযুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: মুখোমুখি ফখরুল ও অলি আহমদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিরতি ভেঙে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবারও ফিরছে রাষ্ট্রপতি পদের সরাসরি ভোটযুদ্ধ। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় পার হলেও লড়াই থেকে সরে দাঁড়াননি দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর কেউই। ফলে আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সরাসরি ব্যালট যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত সমর্থিত ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সুযোগ থাকলেও দুই পক্ষই নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানিয়েছে, তারা এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের জন্য এখন ১০০% প্রস্তুত এবং আজ রাতেই ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ শেষ করবে তারা।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে, গত তিন দশকে প্রায় সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে তাদের শীর্ষ অভিভাবক বেছে নিতে হবে। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষেই চলবে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। ভোট শেষে সাথে সাথেই তারা গণনা শুরু করবে এবং ফলাফল জানিয়ে রাতেই গেজেট প্রকাশ করবে কমিশন। নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কমিশন ইতিমধ্যে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই নির্বাচনী সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনায় সরকার প্রায় $১ (এক) লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে বলে জানা গেছে।

এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে থাকছেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। যদিও সংসদের মোট আসন ৩৫০টি, তবে বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সদস্যপদ আদালত বাতিল করায় একটি আসন বর্তমানে শূন্য রয়েছে। বর্তমান সংসদের সমীকরণ অনুযায়ী, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় পাওয়াটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। সংসদীয় পরিসংখ্যান বলছে, ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে বিএনপির হাতেই রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৬.৬% এর বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অন্যদিকে, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে জামায়াত ও তাদের শরিক দলগুলোর ৯০ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন রয়েছে। বিএনপির বিশাল সংখ্যার কাছে এই ৯০ ভোট পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

তবে এই লড়াইটি শুধু সংখ্যার নয়, এটি বড় দুই জোটের রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এই নির্বাচনের ফলকে অনেকটা নির্ধারিত করে দিয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেন, তবে তার সংসদ সদস্যপদ সাথে সাথেই বাতিল হয়ে যাবে। ফলে বিএনপির কোনো সদস্যের পক্ষে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কোনো আইনী পথ খোলা নেই। দলীয় হাই কমান্ড থেকে ১০০% ভোট নিশ্চিত করতে সব পক্ষই ইতিমধ্যে তাদের সংসদ সদস্যদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় নিশ্চিত জেনেই বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন থেকেই আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ ভোট দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে—একটি মুড়ি অংশ এবং অন্যটি মূল ব্যালট। মুড়ি অংশে সংসদ সদস্যের নাম, ক্রমিক নম্বর ও বিভক্তি নম্বর থাকবে। ভোটারকে তার পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ব্যালট সংগ্রহ করতে হবে। ব্যালটে প্রার্থীদের নাম বাংলা বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী সাজানো থাকবে। অর্থাৎ ‘অ’ দিয়ে অলি আহমদ শুরুতে এবং ‘ম’ দিয়ে মির্জা ফখরুল পরে থাকবেন। সংসদ সদস্যরা তাদের পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষর করে তা নির্দিষ্ট ব্যালট বাক্সে জমা দেবেন। বিকেলেই সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কমিশন জানিয়ে দেবে কে হচ্ছেন পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ সরাসরি ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেই সময় সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল একক প্রার্থী দেওয়ায় অন্য দলগুলো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। ফলে গত সাড়ে তিন দশক ধরে নির্বাচন কমিশন কেবল জয়ী হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে এসেছে। এবার দুই প্রার্থীর অনড় অবস্থানের কারণে সংসদ ভবনের অন্দরমহলে দীর্ঘ সময় পর ব্যালট বাক্সের ভোট গণনা দেখা যাবে। শহরজুড়ে এখন সাধারণ মানুষের মাঝেও এটিই প্রধান আলোচনার বিষয় বা ‘হট কেক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর থেকেই এই পদটি শূন্য রয়েছে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সেই লক্ষ্যেই ২০ আগস্ট ভোটের দিন চূড়ান্ত করেছে কমিশন। যদিও বিএনপির বিশাল সংখ্যার কারণে ফলাফল নিয়ে কোনো সংশয় নেই, তবুও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় পর একটি সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। সবাই এখন তাকিয়ে আছেন বৃহস্পতিবারের দিকে, যখন সংসদ সদস্যরা তাদের স্বাক্ষর দিয়ে দেশের পরবর্তী অভিভাবক চূড়ান্ত করবেন। এই ভোটযুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা আরও শক্তিশালী হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ