ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গোকুলনগর গ্রামে অবশেষে চার মহিষের ভাগ্যের চাকা ঘুরল। গত তিন মাস ধরে হাঁটু সমান কাদার মধ্যে আটকে থাকা এই প্রাণীগুলো এখন বাড়ির পাশের পরিষ্কার ও শুকনা জায়গায় আরাম করছে। মহিষগুলোর মালিক আব্দুল আলীম এখন দিনরাত পরিশ্রম করছেন এদের জন্য একটি স্থায়ী ও মানসম্মত পাকা ঘর তৈরি করতে। কেন এই অবলা প্রাণীগুলোকে এতদিন নরকতুল্য পরিবেশে থাকতে হয়েছিল, তার করুণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন মালিক। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই পরিবর্তনের গল্প এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।
ঘটনার শুরু হয় তিন মাস আগে। গোকুলনগর গ্রামের মৃত ফজর আলীর ছেলে আব্দুল আলীম তার চারটি মহিষকে নিজের বাড়ির উঠানে বেঁধে রাখতেন। কিন্তু টানা বর্ষা আর মহিষের চলাচলের কারণে সেই জায়গাটি গভীর কাদায় পরিণত হয়। মহিষগুলো সেই কাদার মধ্যেই দিনরাত দাঁড়িয়ে থাকত। স্থানীয়রা বারবার অনুরোধ করলেও আলীম মহিষগুলো সরাননি। বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় পরিবেশকর্মী নাজমুল হাসানের। তিনি গত সপ্তাহে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মহিষগুলোর ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। মুহূর্তেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাজ্জাদ হোসেনের নজরে পড়ে।
গত রোববার বিকেলে ইউএনও সরাসরি আলীমের বাড়িতে হাজির হন। তিনি সেখানে গিয়ে মহিষগুলোর করুণ দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তৎক্ষণাৎ সেগুলোকে কাদা থেকে মুক্ত করে উঁচু শুকনা স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সে সময় মালিক বাড়িতে না থাকলেও ইউএনও তার পরিবারকে কড়া নির্দেশ দিয়ে আসেন যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মহিষগুলোর জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের এই কঠোর বার্তার পর আব্দুল আলীম নড়েচড়ে বসেন এবং মহিষগুলোর যত্নে ১০০% মনোযোগী হন।
গতকাল মঙ্গলবার আলীমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। মহিষগুলো এখন শুকনা ও ছায়াযুক্ত স্থানে বাঁধা। আলীম নিজের হাতে খড় ও কুঁড়ো দিয়ে মহিষগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। মহিষগুলোর শরীর এখন কাদাটে নয়, বরং পরিষ্কার। আলীম জানান, তিনি ইচ্ছা করে মহিষগুলোকে কষ্ট দেননি। তার বাড়িটি মাত্র ৬ কাঠা জমির ওপর। সেখানে চার কক্ষের একটি পাকা ঘর তৈরি করছেন তিনি। মহিষ রাখার জন্য আগে একটি ঘর ছিল, কিন্তু সেটি তার বোনের জায়গায় হওয়ায় এবং বোনের সাথে ঝামেলার কারণে সেটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। অন্যদিকে মাঠে ফসল থাকায় এবং অন্যান্য জমির মালিকদের আপত্তির কারণে তিনি বাইরেও মহিষগুলো চরাতে পারছিলেন না।
আর্থিক সংকটের কথা বলতে গিয়ে আলীম বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তার ছেলে মামুন দেশের বাইরে থাকেন এবং মেয়ে চম্পাকে বিয়ে দেওয়ার সময় ও জামাইকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে তিনি অনেক টাকা দেনাগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি আশা করছেন, এই মহিষগুলোকে সুস্থভাবে বড় করে বিক্রি করতে পারলে তার ঋণের ৫০% থেকে ৬০% শোধ হয়ে যাবে। এখন ইউএনওর নির্দেশ পালন করতে তিনি বোনের সাথে মিমাংসা করে সেই জমিটুকু কিনে নিয়েছেন এবং সেখানেই মহিষের জন্য স্থায়ী ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছেন। ঘরের কাজ ইতিমধ্যে ৪০% শেষ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও বসে নেই। ইউএনওর নির্দেশের পর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান একটি মেডিকেল টিম পাঠিয়ে মহিষগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় কাদায় থাকায় মহিষগুলোর পায়ের চামড়ায় কিছুটা সমস্যা দেখা দিলেও বর্তমানে তারা সুস্থ আছে। তাদের শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন জাতীয় কিছু ওষুধ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত যত্ন পেলে মহিষগুলো দ্রুতই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। মালিক এখন প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ মেনেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা তৈরি করছেন।
পরিবেশকর্মী নাজমুল হাসান, যার একটি ফেসবুক পোস্ট এই মহিষগুলোর জীবন বদলে দিল, তিনি এখন বেশ খুশি। তিনি বলেন, “মহিষগুলোর করুণ চাহনি আমার বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এখন যখন দেখি মহিষগুলো শুকনা জায়গায় মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছে, তখন খুব ভালো লাগে। মালিকও তার ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছেন।” আব্দুল আলীমও স্বীকার করেন যে, অবহেলা না করে আগে থেকেই যদি তিনি বিকল্প ব্যবস্থা করতেন, তবে প্রাণীগুলো এতো কষ্ট পেত না।
বর্তমানে মহেশপুর এলাকায় এই ঘটনাটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং প্রশাসন যে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সমস্যাগুলোতেও নজর দিচ্ছে, তা এলাকায় প্রশংসিত হচ্ছে। মহিষগুলো এখন নতুন ঘরে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। আলীম আশা করছেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘরের ছাদ দেওয়ার কাজ শেষ হবে। মহিষের ডেরায় কাদা থাকবে না এই স্বপ্ন এখন গোকুলনগর গ্রামের বাস্তবতায় পরিণত হতে চলেছে।
















