মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের চেয়ে বড় সম্পদ খুব কমই আছে। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের গল্প যদি শেষ হয় এমন কোনো করুণ ট্র্যাজেডিতে, তবে তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। গাজীপুরের দুই বন্ধু মো. হাবিবুর রহমান এবং বিল্লাল মাঝি ঠিক এমন এক শোকাবহ গল্পের জন্ম দিয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার আশায় তারা একসঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রতিবেশী দেশ ভারতে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই বন্ধুই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে তারা সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে আসা কফিনবন্দি লাশে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনায় পুরো গাজীপুর এলাকায় এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত হাবিবুর রহমান (৫৮) গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ফুলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। অন্যদিকে, তার প্রিয় বন্ধু বিল্লাল মাঝির (৫০) বাড়ি ছিল কালীগঞ্জের কাপাসিয়া এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে তারা দুজনেই শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। দেশে চিকিৎসা চললেও আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় তারা গত ১৫ জুন ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই বন্ধুর এই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন তাদের আরেক বিশ্বস্ত বন্ধু মো. আবু নাহিদ (৪৫)। তারা দর্শনা আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং কলকাতার বিখ্যাত এমআর বাঙ্গুর হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, বিল্লাল মাঝি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং হাবিবুর রহমান স্ট্রোকজনিত মারাত্মক সমস্যায় ভুগছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তাদের সুস্থ করে তুলতে। এমনকি উন্নত ওষুধের কারণে চিকিৎসার খরচ পূর্বের চেয়ে প্রায় ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। গত ৯ আগস্ট রাত ৯টা ১৫ মিনিটে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিল্লাল মাঝি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বন্ধুর মৃত্যুর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন বাকি দুজন। কিন্তু শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরদিন অর্থাৎ ১০ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিটে মারা যান মো. হাবিবুর রহমান। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুই বন্ধুর এমন বিদায় যেন হাসপাতালের নার্স ও চিকিৎসকদেরও আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল।
এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপের মুখে পড়েন তাদের সাথে থাকা বন্ধু আবু নাহিদ। বিদেশের মাটিতে দুই বন্ধুর মরদেহ নিয়ে তিনি এক চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছিলেন। একদিকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি জটিলতা। ভারতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক খরচের জন্য তাকে কয়েক হাজার $ (ডলার) সমমূল্যের রুপি খরচ করতে হয়েছে। সকল নিয়মকানুন মেনে এবং ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে অবশেষে ১৬ আগস্ট তিনি মরদেহ দুটি নিয়ে দেশের পথে রওনা হন। আবু নাহিদ জানান, এই কয়েক দিন তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল।
গত ১৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে প্রথমে বিল্লাল মাঝির মরদেহটি দর্শনা আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে এসে পৌঁছায়। তার ঠিক ২০ মিনিট পর অর্থাৎ ৭টা ৩০ মিনিটে হাবিবুর রহমানের মরদেহবাহী গাড়িটি সীমান্তে আসে। দুই বন্ধুর মরদেহ গ্রহণের সময় সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং বাংলাদেশের বিজিবি সদস্যদের সহযোগিতায় যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। দর্শনা ইমিগ্রেশন পুলিশ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে রাত ৮টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স দুটি গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
গাজীপুরের কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জে যখন এই দুই বন্ধুর মৃত্যুর খবর পৌঁছায়, তখন সেখানে কান্নার রোল পড়ে যায়। এলাকাবাসীরা জানান, হাবিবুর ও বিল্লাল সবসময় একসঙ্গেই থাকতেন। তাদের বন্ধুত্ব ছিল এলাকার মানুষের কাছে উদাহরণ। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব যে মৃত্যুর পর ওপার পর্যন্ত স্থায়ী হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিলেন এই দুজন ব্যক্তি। এখন তাদের অবর্তমানে পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিল্লাল মাঝির ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য পরিবারটি ইতোমধ্যেই অনেক দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সময় মানুষ অনেক আশা নিয়ে যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নিয়তি সবকিছু উল্টে দেয়। হাবিবুর ও বিল্লালের এই করুণ মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের অনিশ্চয়তার কথা। তবে এই ট্র্যাজেডির মাঝেও আবু নাহিদের মতো বন্ধুর ত্যাগ প্রশংসার দাবি রাখে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি তার দুই বন্ধুর নিথর দেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে এনেছেন। আজ ১৭ আগস্ট সোমবার যখন দুই বন্ধুকে নিজ গ্রামে দাফন করা হচ্ছে, তখন আকাশ-বাতাস তাদের স্ম স্মৃতিতে ভারি হয়ে উঠছে। দুই বন্ধুর এই অকাল প্রস্থান গাজীপুরের মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘকাল এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে।
















