তারেক রহমানের বক্তব্যের পাল্টা জবাব নাহিদ ইসলামের: ‘গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ হঠকারিতা নয়’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিকে ‘হঠকারিতা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে এক অনুষ্ঠানে সেই বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জনগণের সমস্যা নিয়ে রাজপথে প্রতিবাদ করা কোনোভাবেই হঠকারিতা হতে পারে না, বরং এটি একটি বৈধ গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যখন এই ধরণের মন্তব্য আসে, তখন গণতন্ত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

আজ সোমবার দুপুরে গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন নাহিদ ইসলাম। ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে তিনি বলেন, “আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে হঠকারিতা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে রাস্তায় বসে বিক্ষোভ তারা চায় না। কিন্তু রাস্তায় বসে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা একটি প্রাচীন এবং বৈধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।” নাহিদ অভিযোগ করেন যে, সরকার জনগণের মাঝে এমন এক ধারণা বা বয়ান তৈরি করছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামলে তাকে বাস ভাঙচুরের অপবাদ দিয়ে গ্রেপ্তার করা যায়।

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৪ আগস্ট। ওই দিন ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ভয়াবহ লোডশেডিং ও তীব্র গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে গণসমাবেশ করে এনসিপি। সেই কর্মসূচিতে হারিকেন প্রদর্শন করে বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানান নাহিদ ইসলামসহ দলটির শীর্ষ নেতারা। এর তিন দিন পর গত শনিবার মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাম না করে সেই সমাবেশের সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, ফ্যানের বাতাস খেয়ে হাতে হারিকেন নিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ চাওয়া এক ধরণের হঠকারিতা। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন যে, এখন আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাঙচুর করার রাজনীতির সময় নেই।

প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্যের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দল শুধু সংসদেই নয়, সংসদের বাইরেও জনগণের কথা বলবে এটাই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষণ। তিনি বর্তমানের মুক্ত পরিবেশকে ‘আপৎকালীন’ বলে উল্লেখ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন এই স্বাধীনতা আর কতদিন থাকবে। তার মতে, ধীরে ধীরে মানুষের কথা বলার জায়গা কমে আসছে এবং এই পরিস্থিতি রুখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান যেন তারা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রচার করেন।

অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা নিয়েও কিছু গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি জানান, নতুন সরকার আসার পর অনেক সংবাদকর্মীকে বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু গণমাধ্যম সুনির্দিষ্ট কিছু ছাত্রনেতাদের চরিত্রহননের চেষ্টা করছে বলেও তিনি দাবি করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এনসিপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার একটি বক্তব্যের পর একটি নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একে কি সুস্থ সাংবাদিকতা বলা যায়?

তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সেই উত্তাল সময়ে অনেক সাংবাদিক নিজেদের পেশাদারিত্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশপ্রেম ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সক্রিয়তা না থাকলে আন্দোলন সফল করা অসম্ভব হতো। তিনি জুলাই বিপ্লবে শহীদ ও আহত সাংবাদিকদের পরিবারের জন্য বিশেষ সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত নতুন আইন করার তাগিদ দেন।

সবশেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা দেশে একটি দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিবেশ চাই যেখানে সরকার বা কোনো শক্তিশালী পক্ষ সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেবে না। দেশের উন্নয়নের জন্য সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে আন্দোলনকারীদের হঠকারী বলা হলে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে। গুলশানের এই অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন আরও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, যারা সত্যের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ