বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে আসছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সকল স্তরের কর্মচারীরা এই নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। সচিব কমিটির সকল সদস্য ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন, যা বাস্তবায়নের পথে এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। এই বড় পরিবর্তনের ফলে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে থাকা কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারী এবং তাদের পরিবার সরাসরি উপকৃত হবেন।
নতুন এই বেতন কাঠামো একবারে নয়, বরং দুই ধাপে বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর্মচারীদের শুধু মূল বেতন (Basic Salary) বৃদ্ধি কার্যকর হবে। আর এর ঠিক পরের বছর অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা কার্যকর করা হবে। সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক একটি ই-বুকে এই তথ্য বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ‘নবম পে-স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ শিরোনামে একটি বিশেষ উপশিরোনাম যুক্ত করে এই বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই নতুন বেতন ও ভাতা দেওয়ার জন্য সরকার একটি বিশাল অংকের তহবিল বরাদ্দ রেখেছে। প্রকাশিত ই-বুকের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এছাড়া পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সব মিলিয়ে এই খাতে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশাল এই অংকের বরাদ্দ থেকে বোঝা যায় যে সরকার কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে অত্যন্ত আন্তরিক। অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতার সময় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
এই বেতন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই। তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে এই কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গত ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশন বর্তমানের ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। তারা মনে করেন, বর্তমান বাজারে যেভাবে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাতে কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘ সময় ধরে বেতন না বাড়ায় সাধারণ কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছিল।
জাকির আহমেদ খান কমিশনের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে যে, সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমানে ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এটি বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ পদের বেতনকাঠামো বর্তমানে নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনার জন্য সরকার গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
কেন এই বেতন বাড়ানো প্রয়োজন, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই স্কেলে বেতন নিচ্ছেন। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই সংকট মেটাতেই ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের কাজের উৎসাহ বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের এই সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপকে ইতিমধ্যে সকল মহলে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সচিব কমিটির চূড়ান্ত স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াটি তার অন্তিম ধাপে পৌঁছেছে। এখন খুব শীঘ্রই সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশ করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে যখন এই নতুন বেতন কাঠামো চালু হবে, তখন এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতির সঞ্চার করবে। সরকারের এই ই-বুক প্রকাশের পর সারা দেশের সরকারি কর্মচারীদের মাঝে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন।
















