স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক পরিবর্তন: ৩ বছরের মধ্যে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল হচ্ছে ১৫১ শয্যার, নিয়োগ পাচ্ছেন ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যা বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে ঝিনাইদহের মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এই মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হলে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চিকিৎসার দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৩১ থেকে ৫০ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে জনসংখ্যার তুলনায় শয্যা কম হওয়ায় রোগীদের অনেক সময় হাসপাতালের বারান্দায় বা ফ্লোরে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা ১৫১ তে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এতে সেবার পরিধি প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।” এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ের সাধারণ মানুষ তাদের নিজ এলাকাতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাবেন, যা বড় বড় শহর বা বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে।

হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকট দূর করার বিষয়েও মন্ত্রী বড় খবর দিয়েছেন। তিনি জানান, দেশের উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে খুব শীঘ্রই ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এই বিশাল জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের শূন্য পদগুলো ১০০% পূরণ করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না কোনো রোগী ডাক্তারের অভাবে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাক। নতুন ডাক্তাররা নিয়োগ পেলে গ্রামের মানুষ ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা পাবেন।” এছাড়া পর্যাপ্ত নার্স ও ল্যাব টেকনিশিয়ান নিয়োগের প্রক্রিয়াও সমান্তরালভাবে চলছে।

এই বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বড় অংকের বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, নতুন ভবন নির্মাণ এবং উন্নত যন্ত্রপাতি কেনার জন্য শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও সরকারি তহবিল থেকে এই প্রকল্পের জন্য কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ($) সমপরিমাণ অর্থের সংস্থান করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জনগণের ট্যাক্সের এই বিশাল অংকের টাকার যেন এক পয়সাও অপচয় না হয়, সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি থাকবে। উন্নয়ন কাজে কোনো ধরণের দুর্নীতি বা ধীরগতি বরদাস্ত করা হবে না।”

ঝিনাইদহে ঝটিকা পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তিনি চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা পরীক্ষা করেন এবং ওষুধের মজুদ যাচাই করেন। পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের কিছু অব্যবস্থাপনা দেখে তিনি উষ্মা প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন। মন্ত্রী বলেন, শুধু দালান-কোঠা বা শয্যা বাড়ালেই হবে না, সেবার গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। গরিব রোগীদের সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করার নির্দেশ দেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার (OT) এবং আইসিইউ (ICU) সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অনেক মুমূর্ষু রোগীকে পথেই প্রাণ হারাতে হয়। এই সংকট সমাধানে সরকার প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৫টি করে আইসিইউ শয্যা রাখার চেষ্টা করছে। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে টেলি-মেডিসিন সেবার প্রসার ঘটানো হবে, যাতে করে অজপাড়াগাঁয়ের মানুষও ভিডিও কলের মাধ্যমে ঢাকা বা বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন।

সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে খুশির আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, ৩ বছরের মধ্যে যদি সত্যি ১৫১ শয্যার হাসপাতাল চালু হয়, তবে এটি হবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে একটি বিশাল বিপ্লব। মহেশপুরের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের সামান্য সার্জারির জন্যও যশোর বা ঢাকা যেতে হয়, যেখানে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। এখন যদি বাড়ির পাশেই এই সুবিধা পাই, তবে আমাদের অনেক বড় উপকার হবে।” সাশ্রয় হওয়া এই অর্থ সাধারণ মানুষ তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যয় করতে পারবে।

আগামী ৩ বছর অর্থাৎ ২০২৯ সালের মধ্যে এই কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেই প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেলে পরিণত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ৫ হাজার নতুন ডাক্তারের যোগদানের পর স্বাস্থ্যখাতের চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ চলমান থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ