সরকারি চাকুরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার প্রহর অবশেষে শেষ হতে চলেছে। নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি এখন একদম শেষ পর্যায়ে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার আজ রোববার (১৬ আগস্ট ২০২৬) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নিশ্চিত করেছেন যে, যেকোনো মুহূর্তে এই নতুন পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার কর্মচারীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই আশ্বাসে দেশের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
মুখ্য সচিব আরও বলেন, পে-স্কেলের বিষয়টি বর্তমানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চূড়ান্ত বিবেচনাধীন রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। তিনি স্বীকার করেন যে, জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশের উৎপাদন চেইন বা প্রোডাকশন খাতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। তবে বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মচারীদের এই আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বড় ধরণের সহায়তা করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব দ্রুতই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
উল্লেখ্য যে, গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোতে কাজ করে আসছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েক দফা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। তাই ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের একটি নতুন বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়।
জাকির আহমেদ খান কমিশনের সুপারিশে বেতন বৃদ্ধির হার সবাইকে চমকে দিয়েছে। কমিশন বর্তমানের ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই বেতন-ভাতা ১০০% থেকে ১৪০% পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ২০,০০০ টাকা হবে। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ছে। আর সর্বোচ্চ পদের বেতনকাঠামো বর্তমানে নির্ধারিত ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসা ভাতা, বাড়ি ভাড়া এবং যাতায়াত ভাতাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ছাড়াও অর্থ, জনপ্রশাসন, আইন এবং শিক্ষা সচিবসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। এই কমিটি কমিশনের সুপারিশগুলো আর্থিক সক্ষমতার নিরিখে বিশ্লেষণ করে তাদের প্রতিবেদন প্রায় ১০০% চূড়ান্ত করেছে। তারা যে কোনো দিন এই প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবেন। মন্ত্রিসভা থেকে সবুজ সংকেত পেলেই অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও এই বেতন বৃদ্ধির জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ মোট ৮৯,৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। এটি গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি। সরকার চাইছে পহেলা জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে। তবে বকেয়া হিসেবে কর্মচারীরা পে-স্কেল ঘোষণার দিন থেকেই আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশা করছেন। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ বাড়লেও কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত হবে।
সচিবালয়ের করিডোর থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলোতে এখন আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এই নতুন পে-স্কেল। সাধারণ কর্মচারীরা মনে করছেন, বর্তমান বাজারে সবকিছুর দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই বেতন বৃদ্ধি ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে সচেতন মহলের মতে, বেতন বাড়ানোর সাথে সাথে যদি সরকার বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, তবে এই বাড়তি টাকার সুফল কর্মচারীদের পকেটে থাকবে না। তাই পে-স্কেল ঘোষণার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের আজকের বক্তব্যের পর প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এখন প্রজ্ঞাপন জারির শুভক্ষণের অপেক্ষায় আছেন। যদি সুপারিশ অনুযায়ী ১০০% থেকে ১৪০% বেতন বাড়ে, তবে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বেতন বৃদ্ধি। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেষ পর্যন্ত বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপরেখা কেমন হয়। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য খুব শীঘ্রই বড় ধরণের একটি সুখবর আসছে।
















