টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে বহেড়াতৈল রেঞ্জ কর্মকর্তা এমরান আলীকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি করার নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৮ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ আযম খান। রোববার বেলা দুইটার দিকে উপজেলার হলুদিয়াচালা বাজারে একটি জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে (ডিএফও) এই আদেশ দেন। মন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৯ আগস্ট ভোরে, যখন বন বিভাগের একটি দল হলুদিয়াচালা বাজারে স্থানীয়দের তৈরি করা প্রায় ৬০ হাত দৈর্ঘ্যের একটি বড় টিনের ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। স্থানীয়দের দাবি, তারা রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে এই জমির মালিকানা পেয়েছেন এবং সেখানে প্রায় ১০০% বৈধভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু বন বিভাগের দাবি, ওই জমিটি আটিয়া বন অধ্যাদেশের অধীনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই উচ্ছেদ অভিযানের পরেই এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা মন্ত্রীর কাছে নালিশ জানান।
রোববার বিকেলে মন্ত্রী আহমেদ আযম খান যখন হলুদিয়াচালা বাজারে যান, তখন সেখানে শত শত মানুষ জড়ো হন। উপস্থিত জনসাধারণের সামনেই মন্ত্রী টাঙ্গাইলের ডিএফও মো. নাজমুল আলমকে ফোন করেন এবং লাউড স্পিকার চালু করে কথা বলেন। মন্ত্রী ডিএফওকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হলুদিয়াচালায় মানুষের ঘরটি কেন ভাঙা হলো? রেঞ্জ কর্মকর্তা এমরান আলী আগে দালালদের মাধ্যমে টাকা নিয়ে ঘরটি তোলার অনুমতি দিয়েছিলেন। যখন ঘরটি একটু বড় করা হলো, তখন তিনি সেটি ভেঙে দিলেন। এই বৈষম্য মেনে নেওয়া যায় না। আপনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই কর্মকর্তাকে এখান থেকে সরিয়ে দেবেন এটি আমার সরাসরি নির্দেশ।”
মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করছেন। তিনি বলেন, “টাকা দিলে বনের ভেতর দালান তোলা যায়, কিন্তু টাকা না দিলেই সামান্য টিনের ঘরও অপরাধ হয়ে যায়। আমি যতদিন এই এলাকার এমপি আছি, ততদিন সাধারণ মানুষকে এভাবে হয়রানি হতে দেব না।” তিনি বন বিভাগকে সতর্ক করে বলেন যে, সরকারি আইনের দোহাই দিয়ে গরীবের ঘর ভাঙার এই খেলা বন্ধ করতে হবে। বর্তমান বাজারদরে ওই ঘরটি তৈরিতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল, যা একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি।
এদিকে অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা এমরান আলী তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি মুঠোফোনে জানান, ঘরটি ভেঙে দেওয়ার সময় তিনি শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব। ঘুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি সরকারি কর্মচারী হিসেবে যেখানেই বদলি হই না কেন, বন রক্ষায় আমার কাজ চালিয়ে যাব।” তবে তার এই বক্তব্যে স্থানীয়রা সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
সখীপুর এলাকায় আটিয়া বন-৮২ অধ্যাদেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। বন বিভাগ মনে করে এই এলাকার বিশাল অংশ তাদের সম্পদ, অন্যদিকে স্থানীয়দের কাছে পৈতৃক আমলের বৈধ দলিল রয়েছে। এই আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা নিয়মিত সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশের পর ডিএফও মো. নাজমুল আলমের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
হলুদিয়াচালা বাজারের এই জনসভায় বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী এবং শত শত ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে তারা সাহসী ও জনবান্ধব হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের দলিল থাকার পরও বন বিভাগ মাঝেমধ্যেই উচ্ছেদ করতে আসে। টাকা দিলে সব ঠিক হয়ে যায়, না দিলে মামলা দেওয়া হয়। মন্ত্রী আজ সঠিক বিচার করেছেন।” ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রেঞ্জ কর্মকর্তার বদলি কার্যকর হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রমাণের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
















