চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর রেল স্টেশনের অদূরে এক মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় মিনি খাতুন (৬০) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। আজ রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ০৯:২০ মিনিটের দিকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। চুয়াডাঙ্গা সদরের মোমিনপুর ইউনিয়নের রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় দ্রুতগামী একটি আন্তঃনগর ট্রেনের ধাক্কায় তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কাটিয়ে সুস্থ হওয়ার আশায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথেই এই নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করতে হলো তাকে। নিহতের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম।
নিহত মিনি খাতুন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার শিয়ালমারী গ্রামের মৃত ইউনুস আলীর স্ত্রী। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মিনি খাতুন গত কয়েক বছর ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। বিশেষ করে তার মাথায় দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা ছিল, যার কারণে তিনি প্রায়ই আবোল-তাবোল কথা বলতেন বা একা একা হাঁটাচলা করতেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি অনেক টাকা খরচ করেছেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা এবং আন্তর্জাতিক হিসেবে ধরলে কয়েক হাজার ডলার ($) ছাড়িয়ে যাবে। তবুও তার রোগ পুরোপুরি সারেনি। এই অসুস্থতার কারণেই হয়তো তিনি রেললাইনের ওপর ট্রেনের আওয়াজ বা বিপদ টের পাননি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিনি খাতুনকে মোমিনপুর রেল স্টেশনের পাশেই রেললাইনের ওপর দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজশাহী থেকে খুলনা অভিমুখে ছুটে আসছিল আন্তঃনগর ‘সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি। লাইনের ওপর মানুষ দেখে ট্রেনটি তীব্র হুইসেল বা সংকেত দিলেও মিনি খাতুন লাইনের ওপর থেকে সরে যাননি। ট্রেনের প্রচণ্ড গতির ধাক্কায় তিনি ছিটকে লাইনের পাশে পড়ে যান এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তাৎক্ষণিক মারা যান। উপস্থিত লোকজন সাহায্য করার সুযোগ পাওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী এবং মোমিনপুর স্টেশনের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে রেলওয়ে থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পাওয়ার কিছুক্ষণ পর রেলওয়ে জিআরপি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে। পুলিশ জানায়, অসতর্কতার কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বৃদ্ধার মানসিক ভারসাম্য কিছুটা কম থাকায় তিনি ট্রেনের উপস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পুলিশ নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বাংলাদেশে রেলপথে হওয়া দুর্ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৮০% থেকে ৯০% দুর্ঘটনাই ঘটে অসতর্কতার কারণে। অনেকে কানে হেডফোন লাগিয়ে বা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটেন, যা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আবার অনেক বয়স্ক মানুষ শারীরিক দুর্বলতা বা শ্রবণশক্তির অভাবে ট্রেনের সংকেত শুনতে পান না। চুয়াডাঙ্গার এই ঘটনাটিও একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। রেললাইনের দুই পাশে মানুষের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এমন অকাল মৃত্যু ঠেকানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিনি খাতুনের মৃত্যুতে তার গ্রাম শিয়ালমারীতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার স্বজনরা জানান, তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। চিকিৎসার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরবেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। গ্রামের মানুষ জানান, এই বৃদ্ধা তার পরিবারের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। তার এমন চলে যাওয়া পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। চিকিৎসকের পেছনে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হলো না, উল্টো দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হলো—এটিই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
বর্তমানে মরদেহটি পুলিশি তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বারবার সতর্ক করার পরও মানুষ কেন রেললাইনে হাঁটাচলা করে, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সচেতন মহলের মতে, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো জরুরি। ১০০% সচেতনতা ছাড়া রেল দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা অসম্ভব। চুয়াডাঙ্গা সদরের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, সামান্য অসাবধানতা একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
















