কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াত দলীয় এমপি আমির হামজার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সন্ধ্যা ৫:৪৫ মিনিটের দিকে শহরের ব্যস্ততম ছয় রাস্তার মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। গণ অধিকার পরিষদের একটি সমাবেশ চলাকালীন এমপির গাড়ি সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় ইটের আঘাতে পেছনের কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে জামায়াত ও গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধে। এতে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং শহরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ১০০% আতঙ্ক দেখা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার পরিষদকে নিয়ে কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। এর প্রতিবাদে আজ বিকেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সমাবেশ চলাকালেই এমপির গাড়ি সেখানে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। একপর্যায়ে ইটের আঘাতে এমপির গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গাড়ির ভাঙা কাচ ও বডি মেরামতে প্রায় ৫০,০০০ টাকার (যা প্রায় ৪২০ ডলার বা $ এর সমান) সম্পদ নষ্ট হয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও আকস্মিক এই বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে হিমশিম খান।
হামলার পর জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা দ্রুত এমপিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। এরপরই শুরু হয় পাল্টা হামলা। সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমির হামজার সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরের হাইস্কুল মার্কেটে অবস্থিত গণ অধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। তারা কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলে। এরপর হরিপুর ব্রিজের কাছে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত অফিসেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। এই সময় পুরো এলাকায় প্রায় ৮০% দোকানপাট মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন দাবি করেছেন, গণ অধিকার পরিষদের সাথে ছাত্রদলের কর্মীরা যোগ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এমপির ওপর এই হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, এমপির শারীরিক কোনো বড় ক্ষতি না হলেও তার গাড়ির পেছনের অংশ পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামায়াত এই ঘটনায় থানায় মামলা করবে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করেছেন, জামায়াতের হামলায় তাদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে সতর্কবাণী দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনার পথ আপনাদের ডাকছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর অন্তত ৩ জন ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা হাসপাতাল ছেড়েছেন। ইটের আঘাতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটাছেঁড়া ও কালশিটে জখম হয়েছে বলে ডাক্তাররা নিশ্চিত করেছেন। ঘটনার সময় কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর সহ পুলিশের একটি বড় দল পাশেই ছিল। ওসি জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এমপির বাড়িতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে এমপির গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে, যা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার এই উত্তাপ এখন পুরো কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার অবশ্য জামায়াতের করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ছাত্রদলের কর্মীরা কোনো হামলা করেনি, বরং তারা দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে। তার মতে, আমির হামজার উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে শহরে থমথমে ভাব বিরাজ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশের ১০০% টহল বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপের দিকে না যায়, সেজন্য প্রশাসন উভয় রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে।
শনিবার রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। তবে এমপির মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে, হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা করা হয়েছিল। তারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষ এখন বড় ধরনের কোনো সংঘাতের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন।
















