ঝিনাইদহ-১ (শৈলকূপা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা নায়েব আলী জোয়ার্দারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দিবাগত রাত ২:৩০ মিনিটের দিকে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর জামতলা মডেল মসজিদ পাড়ার নিজ বাসভবন থেকে তাকে আটক করা হয়। শৈলকূপা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। গভীর রাতে এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
নায়েব আলীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ২টার পর হঠাৎ করেই শৈলকূপা থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের একটি বড় দল তার বাড়িটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর পুলিশ সদস্যরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সাবেক এই সংসদ সদস্যকে আটক করে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছে যে একটি নাশকতার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে ঠিক কোন মামলায় তাকে ধরা হয়েছে, তা নিয়ে রাতে পরিষ্কার কিছু জানানো হয়নি। শনিবার দুপুর নাগাদ তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এদিকে অন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, নায়েব আলী জোয়ার্দার সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে গোপন বৈঠক করে এলাকায় বড় ধরনের অশান্তি সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাকে গ্রেপ্তারের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। মূলত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার আশঙ্কায় এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড পুনর্গঠনের চেষ্টার অভিযোগে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
শৈলকূপা এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ঝিনাইদহের প্রায় ৮০% আওয়ামী লীগ নেতা আত্মগোপনে চলে যান। তবে নায়েব আলী মাঝে মাঝে এলাকায় দেখা দিচ্ছিলেন। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, জেলায় বর্তমানে ১০০টিরও বেশি নাশকতার মামলা চলমান রয়েছে। এসকল মামলার ৫% আসামিও যদি গ্রেপ্তার হয়, তবে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছে প্রশাসন। নায়েব আলীর মতো হেভিওয়েট নেতা ধরা পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আটকের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে শৈলকূপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ন কবির মোল্লার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি এই বিষয়ে কোনো দীর্ঘ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সংক্ষেপে জানান যে, একটি নির্দিষ্ট মামলার প্রেক্ষিতে তাকে আটক করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগের বিষয়টি তিনি সরাসরি অস্বীকার বা স্বীকার কোনোটাই করেননি। পুলিশের এই গোপনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
নায়েব আলী জোয়ার্দারের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা বলছেন, নায়েব আলী একজন বয়স্ক মানুষ এবং তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তবে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বলছিলেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন এই নেতার দাপট ছিল আকাশচুম্বী। অনেকেই মনে করছেন, বিগত ১৫ বছরে এলাকায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, তার বিচার হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ এলাকায় কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা এড়াতে ১০০% সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
শনিবার বিকেলে নায়েব আলীকে যখন প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নেওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকেই স্লোগান দিচ্ছিলেন আবার অনেকেই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। শৈলকূপা ও ঝিনাইদহ শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার এবং কোনো প্রকার গুজব না ছড়ানোর জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বর্তমানে সাবেক এই সংসদ সদস্য ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা নাশকতার মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হতে পারে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। ঝিনাইদহের রাজনীতিতে এই গ্রেপ্তার এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতে আর কে কে পুলিশের জালে ধরা পড়েন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
















