গত তিন সপ্তাহ ধরে সারা দেশে গ্যাসের তীব্র হাহাকার চলছে। বিশেষ করে রান্নার চুলা থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পকারখানা সবখানেই একই করুণ দশা। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন সামিটের টার্মিনাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, তখন মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। তবে সংকটের এই অন্ধকারের মাঝে শুক্রবার সন্ধ্যায় কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এলএনজি নিয়ে নতুন একটি জাহাজ এসে পৌঁছেছে। আশা করা হচ্ছে, শনিবার সকালের মধ্যেই পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করবে।
গ্যাস সংকটের নেপথ্যে রয়েছে একের পর এক কারিগরি জটিলতা এবং আমদানিকৃত জাহাজের ত্রুটি। পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, সৌদি আরামকো থেকে যে এলএনজি জাহাজটি এসেছিল, সেটিতে বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সক্ষমতা বা ‘কমপ্যাটেবিলিটি’ থাকতে হয়। কিন্তু আরামকোর ওই জাহাজে সেই ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০% ঝুঁকি এড়াতে জাহাজটি ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ‘ভিটল এশিয়া’র নতুন একটি জাহাজ সামিটের টার্মিনালে ভিড়েছে। এখান থেকে গ্যাস খালাস করে পাইপলাইনে পাঠাতে সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। অর্থাৎ, শনিবার ভোররাত ২টা থেকে পুরোদমে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।
এদিকে একটি সমস্যা কাটতে না কাটতেই অন্য আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে। শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে এখান থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রাত ৮টা পর্যন্ত এটি সচল করা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত ২১ জুলাই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই টার্মিনালের একটি বয়লার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে এর সক্ষমতা এমনিতেই অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। এখন দ্বিতীয় বয়লারটিতেও সমস্যা দেখা দেওয়ায় এলএনজি সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রকৌশলীরা রাতদিন কাজ করছেন এই ত্রুটি সারাতে। তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি পুরোপুরি ঠিক করতে হলে সামনে আরও ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ রাখা লাগতে পারে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বর্তমান সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট বোঝা যায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে আমরা অন্তত ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ পেয়ে অভ্যস্ত। এর মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। কিন্তু গতকাল বিকেলের পর এলএনজি সরবরাহ ৩০ কোটি ঘনফুটেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ এখন ১৯৩ কোটি ঘনফুটে ঠেকেছে। এর মানে হলো চাহিদার প্রায় ৫০% গ্যাসই এখন পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিশাল ঘাটতির কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোর সিএনজি স্টেশনগুলোতে কয়েক কিলোমিটার লম্বা সারি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪০% থেকে ৫০% ফিলিং স্টেশন গ্যাসের অভাবে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে। আরামকোর জাহাজ ফেরত পাঠানো নিয়ে তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে অনুপযুক্ত জাহাজ থেকে গ্যাস নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। তবে ভিটলের জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া শুরু হলে সামিট তাদের সরবরাহ আবার ৫০ কোটি ঘনফুটে নিয়ে যেতে পারবে। এতে মোট সরবরাহ বেড়ে ২৪৩ কোটি ঘনফুটে দাঁড়াবে। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এক্সিলারেটের কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে মনে রাখতে হবে, গ্যাসের এই ঘাটতি পুরোপুরি মেটানো এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। গত কয়েক দিনে দেশের ২০% এর বেশি টেক্সটাইল ও নিত্যপণ্যের কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা মালিক জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় তাদের উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০% বেড়ে গেছে এবং সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না। এর ফলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধু শিল্পই নয়, বাসাবাড়িতেও গৃহিণীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অল্প আঁচে চুলা জ্বলছে, যার ফলে খাবার হোটেলগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে প্রায় ৭০%।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে সরকার অনেকটা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে আছে। বঙ্গোপসাগর শান্ত থাকলে এবং নতুন জাহাজগুলো থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া গেলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে গরম কম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম ছিল, তাই লোডশেডিং খুব একটা ভোগায়নি। তবে আবহাওয়া আবার উত্তপ্ত হলে এবং গ্যাস সংকট না কাটলে বিদ্যুতের লোডশেডিংও পাল্লা দিয়ে বাড়বে। সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা, দ্রুত এই সংকটের অবসান হোক এবং কলকারখানা ও চুলাগুলো আবার সচল হয়ে উঠুক।
















