চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিদ্যুতের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে প্রচণ্ড গরমে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ রুহুল আমিন এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আজ ১৩ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে মুক্তি দেওয়া এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
সকাল ১০টায় এমপি রুহুল আমিনের নিজ কার্যালয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলার বিদ্যুৎ সমস্যার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সংসদ সদস্য কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দেন, সাধারণ মানুষের করের টাকায় বেতন পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের সেবার মানসিকতা বাড়াতে হবে। বৈঠকে মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম স্বদেশ কুমার ঘোষসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা এলাকার বিদ্যুৎ লাইনের সক্ষমতা এবং বর্তমান চাহিদার একটি চিত্র সংসদ সদস্যের সামনে তুলে ধরেন।
স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এমপি রুহুল আমিন বলেন, জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনোভাবেই লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট সহ্য করা হবে না। এই দুটি হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ ও গর্ভবতী মায়েরা সেবা নিতে আসেন। বিশেষ করে অপারেশনের সময় বা জরুরি বিভাগে যদি হুট করে বিদ্যুৎ চলে যায়, তবে রোগীদের জীবন সংকটে পড়ে। তিনি নির্দেশ দেন যে, এই দুই হাসপাতালে যেন ৯৯.৯৯% সময় বিদ্যুৎ থাকে। প্রয়োজনে বিকল্প ফিডার বা শক্তিশালী জেনারেটরের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ যাতে সামান্য বিদ্যুতের অভাবে নষ্ট না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিতে বলেন তিনি।
বৈঠকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম স্বদেশ কুমার ঘোষ জানান, তারা গ্রাহক সেবা উন্নত করতে দিনরাত কাজ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত এক বছরে এলাকায় বিদ্যুৎ অপচয় বা সিস্টেম লস প্রায় ১২% কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে কারিগরি ত্রুটির কারণে লোডশেডিং দিতে হয়। তিনি এমপিকে আশ্বাস দেন যে, তার নির্দেশনা অনুযায়ী তারা এখন থেকে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া গ্রাহকদের ডিজিটাল মিটারের সমস্যা এবং অতিরিক্ত বিলের অভিযোগগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য একটি বিশেষ হেল্পলাইন বা সেল গঠন করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসন এলাকাটি মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের প্রায় ৭০% মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত। কৃষিতে সেচ কাজের জন্য বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বৈঠকে রুহুল আমিন বলেন, কৃষকদের সেচ পাম্প চালানোর সময় যেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সেচ বিঘ্নিত হলে শস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা সরাসরি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেন যে, বিদ্যুৎ খাতে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে, যার সুফল যেন সাধারণ মানুষ সরাসরি পায়।
এছাড়া বৈঠকে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। গ্রাহকরা অনেক সময় অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করে কর্মকর্তাদের পান না এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এমপি নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে যেন মেরামতের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টিতে ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ তার মেরামতে যেন কোনোভাবেই বিলম্ব না হয়। কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে তিনি সরাসরি বলেন, “মানুষকে সেবা দিতে না পারলে পদে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকায় প্রায় $৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের নতুন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। এই বড় প্রকল্পগুলো শেষ হলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট অনেকাংশে কমে আসবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুতের লোড ম্যানেজমেন্ট এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। এমপি রুহুল আমিন এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুফল তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কর্মকর্তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি চান চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি মানুষ যেন আস্থার সাথে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সংসদ সদস্য আবারও দায়িত্বশীলতার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গাকে একটি স্মার্ট ও উন্নত জেলায় রূপান্তর করতে হলে আধুনিক বিদ্যুৎ সেবার বিকল্প নেই। চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন আলো পৌঁছায় এটাই তার প্রধান লক্ষ্য। বৈঠকের এই তড়িৎ সিদ্ধান্তে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা মনে করছেন, সংসদ সদস্যের এই সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের দীর্ঘদিনের আলসেমি দূর হবে এবং সেবার মান উন্নত হবে।
















