ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদকবিরোধী এক বিশেষ অভিযানে ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন (৪৮) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখ, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ঠিক ১৮:৩০ ঘটিকার সময় উপজেলার শেখ পাড়া গ্রামের রাহাতুন্নেসা গার্লস স্কুলের পূর্ব পাশে অভিযানটি চালানো হয়। গ্রেপ্তারকৃত বিল্লাল হোসেন উপজেলার আনন্দনগর গ্রামের মৃত জুলমত মন্ডলের ছেলে। দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে তাকে হাতেনাতে ধরতে সক্ষম হয়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শেখ পাড়া গ্রামের ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ভাই ভাই সাইকেল স্টোরের সামনের পাকা রাস্তায় বিল্লাল হোসেনের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ তাকে চ্যালেঞ্জ করে। পালানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। পুলিশ সদস্যরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং দেহ তল্লাশি শুরু করে। তল্লাশির এক পর্যায়ে তার কাছে থাকা কাগজের মোড়কে মোড়ানো ৮৮ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়। কাগজসহ এই মাদকদ্রব্যের মোট ওজন দাঁড়িয়েছে ৩০০ গ্রাম।
স্থানীয়রা জানান, ভাই ভাই সাইকেল স্টোরের সামনের এই এলাকাটি সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়। বিশেষ করে পাশের একটি বালিকা বিদ্যালয় থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করত। পুলিশের এই তড়িৎ পদক্ষেপে এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিল্লালকে এর আগেও এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখা গেছে, কিন্তু তার কাছে মাদক ছিল তা কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি। আজকের অভিযানে তার আসল পরিচয় সবার সামনে প্রকাশ পেয়েছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, মাদক নির্মূলে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন। তিনি বলেন, বিল্লাল হোসেন একজন পেশাদার মাদক কারবারি এবং তার বিরুদ্ধে থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিল্লাল স্বীকার করেছেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেটে মাদক সরবরাহ করে আসছিলেন। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে মাদক অপরাধের হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
উদ্ধারকৃত মাদকের আনুমানিক বাজার মূল্য নিয়ে পুলিশ জানায়, স্থানীয় খুচরা বাজারে এর দাম কয়েক হাজার টাকা হলেও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শৈলকুপার মতো এলাকাগুলোতে মাদকের এই বিস্তার রোধ করতে পুলিশ নিয়মিত টহল বৃদ্ধি করেছে। এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি বছরে এই অঞ্চলে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২০% বেড়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং অসতর্কতার সুযোগে অনেক মধ্যবয়সী মানুষ এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। আটক বিল্লালের মতো মাদক কারবারিরা মূলত যুবসমাজকে টার্গেট করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে।
বর্তমানে শৈলকুপার এই মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভাঙতে পুলিশ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছে। জানা গেছে, উদ্ধারকৃত এই ৩০০ গ্রাম গাঁজার আনুমানিক আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় $৪০ ডলারের কাছাকাছি, যা স্থানীয় মুদ্রায় অনেক বেশি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, এই ধরনের ছোট ছোট চালানই পরে বড় আকারে শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, শুধু বিল্লাল নয়, এই চক্রের পেছনে যারা বড় মাপের কুশীলব রয়েছে, তাদেরও খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। বিল্লালকে আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
মাদকের করাল গ্রাস থেকে শৈলকুপাকে রক্ষা করতে স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ প্রশাসন। মাদকাসক্তির ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন, জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য প্রদান করলে ঝিনাইদহ জেলাকে সম্পূর্ণ মাদকিমুক্ত করা সম্ভব হবে। বিল্লাল হোসেনের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটি অংশ মাত্র। আজকের এই অভিযানের পর থেকে শেখ পাড়া এলাকায় পুলিশি নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সাহস না দেখায়।
















