গত শুক্রবার পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তুরস্কের পক্ষ থেকে ১০০% জোর দেওয়া হলেও সৌদি আরবের সরাসরি বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। রিয়াদের স্পষ্ট অবস্থান হলো, মিসরকে এই গুরুত্বপূর্ণ জোটে নেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই নয়। তিনটি বিশ্বস্ত সৌদি সূত্র থেকে জানা গেছে যে, মিসরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের ওপর সৌদি আরব মোটেও সন্তুষ্ট নয়। রিয়াদের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, একসময় মিসরের যে সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল, তা এখনকার প্রেক্ষাপটে আর অবশিষ্ট নেই।
সৌদি আরবের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কাজ করছে। ২০১৩ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সৌদি আরব দেশটিকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা ও সস্তা জ্বালানি দিয়ে আসছে। কিন্তু বিনিময়ে বড় কোনো নিরাপত্তা ইস্যুতে কায়রোর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সমর্থন পায়নি রিয়াদ। রাজপরিবারের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সরাসরি বলেছেন যে, মিসর ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলতে পছন্দ করে। তারা কেবল নিতে জানে, কিন্তু বিনিময়ে বা প্রতিদানে কিছুই দিতে রাজি নয়। রিয়াদ এখন মিসরকে একটি নির্ভরযোগ্য সামরিক শক্তির বদলে কেবল সাহায্যের ওপর টিকে থাকা একটি দেশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
সৌদি আরবের এই অনীহার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে মিসরের ঘনিষ্ঠতাও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেখানে মিসর পরোক্ষভাবে আবুধাবিকে সমর্থন দিচ্ছে। সৌদি কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের সম্ভাব্য হামলার সময় মিসর আবুধাবিতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠালেও সৌদির বিপদে তারা হাত গুটিয়ে ছিল। এই ‘একতরফা’ বন্ধুত্বের কারণে কায়রোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে রিয়াদের মনে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। রিয়াদ মনে করে, মিসরের কৌশলগত অগ্রাধিকার এখন সৌদি স্বার্থের চেয়ে আবুধাবির স্বার্থের সাথে বেশি মিশে গেছে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দিক থেকেও মিসর এখন তুরস্ক বা পাকিস্তানের ধারেকাছে নেই বলে মনে করছে সৌদি আরব। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে ১০০% আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, যারা ড্রোন ও যুদ্ধবিমান তৈরিতে বিশ্বে নাম করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক শক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম সুসংগঠিত ও বিশাল সেনাবাহিনী। কিন্তু মিসরের বর্তমান সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা এখন কেবল সাধারণ সবজি উৎপাদন বা বেসামরিক পণ্য তৈরির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা তুরস্কের চেয়ে অন্তত ৩০% থেকে ৪০% পিছিয়ে আছে। রিয়াদ মনে করে, এই তিন দেশের জোটে মিসর আসলে বাস্তবে কোনো কার্যকর সামরিক অবদান রাখতে পারবে না।
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ হিসেবে পরিচিত মিসর এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে মিসর যে বড় ভূমিকা রেখেছিল, আজকের বাস্তবতায় তারা কেবল একটি ছায়া মাত্র। এমনকি কুয়েতের মতো দেশগুলোও এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মিসরের চেয়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে এই নতুন মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে বেশি আগ্রহী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কায়রোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রভাবও এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তারা এখন নিজেদের ভঙ্গুর অর্থনীতি সামলাতেই ব্যস্ত, যার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় কোনো ভূমিকা রাখার সক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলেছে।
তবে সৌদি আরব বলছে যে, ভবিষ্যতে মিসরের জন্য এই জোটে যোগ দেওয়ার পথ হয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কারিগরি ও রাজনৈতিক কিছু বড় বিষয়ের সমাধান হলে আগামীতে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জোটে নতুন সদস্য আসার সুযোগ সবসময় আছে। আপাতত রিয়াদ চাইছে এমন এক শক্তিশালী জোট, যেখানে সদস্যরা একে অপরের জন্য ১০০% প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। মিসরকে আপাতত বাইরে রেখেই এই তিন মুসলিম দেশের নতুন যাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী মেরুকরণের জন্ম দিল।সম্পর্ক
















