চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে এক জোরালো অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলা এই অভিযানে তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মোট ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চলাকালীন বাজারগুলোতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেমন চাঞ্চল্য দেখা গেছে, তেমনি সাধারণ ক্রেতারা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
অভিযান সূত্র থেকে জানা যায়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসানের নেতৃত্বে এই তদারকি কার্যক্রম শুরু হয়। তারা প্রথমেই কার্পাসডাঙ্গা এলাকার বাজারে হানা দেন। সেখানে দেখা যায়, মেসার্স গাউছিয়া স্টোর নামের একটি বড় মুদি দোকানে পণ্যের কোনো মূল্যতালিকা ঝোলানো নেই। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি দোকানে ক্রেতাদের সুবিধার্থে পণ্যের দাম লিখে রাখা ১০০% বাধ্যতামূলক। মূল্যতালিকা না থাকার সুযোগে অনেক ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৫-১০% পর্যন্ত বাড়তি দাম আদায় করেন। এই অপরাধে দোকানের মালিক মো. আব্দুল হাই সিদ্দিককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এরপর তদারকি টিম দামুড়হুদা বাজারে গিয়ে মেসার্স ভাই ভাই হোটেলে প্রবেশ করে। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, রান্নার কাজে আয়োডিনহীন মোটা লবণ ব্যবহার করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, আয়োডিনহীন লবণ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের বুদ্ধি বিকাশে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাজারে মানসম্পন্ন লবণের চেয়ে এই লবণের দাম ১০-১৫ টাকা কম হওয়ায় কিছু অসাধু হোটেল মালিক বাড়তি মুনাফার আশায় এটি ব্যবহার করেন। হোটেলের এই গাফিলতির কারণে মালিক মো. লিটন আলীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সাথে হোটেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয় যাতে ভবিষ্যতে তারা ১০০% মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার করেন।
একই বাজারের মেসার্স সেলিম মিষ্টান্ন ভান্ডারে তল্লাশি চালিয়ে আরও ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান কর্মকর্তারা। সেখানে দই তৈরির কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না এবং মিষ্টি তৈরির কারখানার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, দইয়ের পাত্রে কোনো উৎপাদন বা মেয়াদের তারিখ লেখা ছিল না। সাধারণত মেয়াদের তারিখ না থাকলে ক্রেতারা ৩০-৪০% ক্ষেত্রে বাসি বা নষ্ট পণ্য কিনে প্রতারিত হন। এসব অনিয়ম ও নোংরা পরিবেশে মিষ্টি সংরক্ষণের দায়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. সেলিম উদ্দীনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কর্মকর্তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, জনস্বাস্থ্যের সাথে কোনো আপস করা হবে না।
পুরো অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান জানান, বাজারে অস্থিরতা কমাতে এবং ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। এই অভিযানে ভোক্তা অধিকারকে সার্বিক সহযোগিতা করেন ক্যাব-এর জেলা প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল। তারা কেবল জরিমানা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং প্রতিটি দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, তারা যেন প্রতিদিন পণ্যের মূল্যতালিকা হালনাগাদ করেন এবং কোনো অবস্থাতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বা নিম্নমানের শিশুখাদ্য বিক্রি না করেন।
অভিযান শেষে স্থানীয়রা জানান, গ্রামগঞ্জের বাজারগুলোতে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করেন। বিশেষ করে সার, বীজ এবং ওষুধের দোকানে সাধারণ মানুষ প্রায়ই প্রতারণার শিকার হন। আজকের এই অভিযানে সার ও বীজের দোকানেও তদারকি চালানো হয়েছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, যদি কোনো বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে ১% টাকাও বেশি নেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারগুলোতে সুশাসন বজায় রাখতে এই ধরণের অভিযান অন্তত মাসে ৫-৬ বার পরিচালনা করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই কার্যক্রমের ফলে দামুড়হুদার ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরণের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে দোকানের সামনে মূল্যতালিকা টাঙানো শুরু করেছেন। ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তারা সামনের দিনগুলোতেও জেলার প্রতিটি বাজারে এই ধরণের অভিযান অব্যাহত রাখবেন। কোনো ব্যবসায়ী যদি সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াতে চায় কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ২৫ হাজার নয়, প্রয়োজনে আরও বড় অংকের জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষ যেন ন্যায্যমূল্যে ভেজালমুক্ত পণ্য পায়, সেটি নিশ্চিত করাই এই দপ্তরের প্রধান লক্ষ্য।
















