চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও অঘোষিত লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে এবার রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে আগামীকাল বুধবার (১২ আগস্ট) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (ডিসি অফিস) ঘেরাও ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় এই প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সরাসরি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে তাদের কষ্টের কথা ও দাবিগুলো পৌঁছে দেবেন।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। বর্তমানে এই ইনস্টিটিউটে পর্ব সমাপনী পরীক্ষা চলছে, যা একজন শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারের জন্য ১০০% গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরীক্ষার এই সময়ে দিনে ও রাতে অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুর রাহিম এবং শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ ও রিপন আলী জানান, বিদ্যুতের অভাবে কেবল পড়াশোনা নয়, ব্যবহারিক ক্লাসগুলোও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। বারবার লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎ বিতরণে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ থাকলেও মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। বর্তমানে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% ঘাটতি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘাটতির পুরো ধকল পলিটেকনিক সংলগ্ন বারঘরিয়া ও এর আশেপাশের এলাকার মানুষের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। অঘোষিত লোডশেডিংয়ের কারণে এলাকার ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০%, আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতেও ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তাররা।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা আটটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন। তাদের প্রধান দাবি হলো—পরীক্ষা চলাকালীন কোনোভাবেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে পারে। এছাড়া তারা লোডশেডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য সময়সূচি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখন আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। ফলে ১০০% মানুষ এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এই ডিজিটাল যুগে এসেও বিদ্যুৎ নিয়ে এমন লুকোচুরি খেলা মেনে নেওয়া যায় না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছেন, বারঘরিয়া সংলগ্ন পলিটেকনিক এলাকার ৪ নম্বর ফিডারের সক্ষমতা অনেক কম। এই ফিডারের আওতায় গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেও লোড নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। ফলে সামান্য বাতাস বা বৃষ্টি হলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তারা দাবি তুলেছেন যে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিদ্যুৎ সংযোগ যেন পিডিবি বা নেসকোর সরাসরি আওতাভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এই ফিডারে যে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কোনোভাবেই কমছে না। এ ছাড়া বারঘরিয়া এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের মতে, তারা বারবার মৌখিকভাবে বিদ্যুৎ বিভাগকে জানালেও কোনো প্রতিকার পাননি। তাদের মনে হচ্ছে, স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস সাধারণ মানুষের কষ্টকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই তারা ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। আব্দুর রাহিম বলেন, “আমরা বিদ্যুৎ ভিক্ষা চাচ্ছি না, আমরা আমাদের অধিকার চাচ্ছি। আমরা বিল পরিশোধ করি, অথচ পরীক্ষার সময় আমাদের অন্ধকারে থাকতে হয়। এটি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।” তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি তাদের ৮ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে তারা পরবর্তী সময়ে আরও বৃহত্তর এবং কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন।
আগামীকালের এই কর্মসূচিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সব সাধারণ শিক্ষার্থীকে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকরা। তারা মনে করেন, কেবল শিক্ষার্থীরা নয়, সাধারণ মানুষেরও এই আন্দোলনে সংহতি জানানো উচিত। কারণ লোডশেডিংয়ের কারণে কেবল পড়াশোনা নয়, জেলার সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। শত শত ছাত্রছাত্রীর এই সমাবেশ থেকে বিদ্যুতের সুষ্ঠু ও বৈষম্যহীন বণ্টন নিশ্চিত করার ডাক দেওয়া হবে। এখন দেখার বিষয়, জেলা প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগ এই সংকট সমাধানে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
















