ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে রীতিমতো বাজিমাত করেছে শৈলকূপা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফলাফল হাতে আসতেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যেন খুশির জোয়ার বয়ে যায়। ৮৮.৯৯ শতাংশ পাসের হার নিয়ে উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে শীর্ষ স্থানটি দখল করে নিয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী বালিকা বিদ্যালয়টি। শুধু পাসের হারেই নয়, বরং গুণগত মান এবং মেধার দিক থেকেও তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। শৈলকূপার অন্য অনেক নামী স্কুলকে টেক্কা দিয়ে মেয়েদের এই সাফল্য এখন পুরো উপজেলার আলোচনার মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিস্তারিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর বিদ্যালয়টি থেকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৮৮.৯৯ শতাংশ (%)। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে মোট ২০ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ (এ+) অর্জন করেছে। তবে সাফল্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখা থেকেও ২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। সব মিলিয়ে মোট ২২ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়ে বিদ্যালয়ের গৌরব উজ্জ্বল করেছে। এই ফলাফলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে।
বর্তমান সময়ে পড়াশোনার খরচ চালানো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী, একটি মেয়ের পড়াশোনার পেছনে প্রতি মাসে গড়ে ৫০থেকে৭০ডলার সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে অনেক অভিভাবককে। গত এক বছরে খাতা, কলম এবং গাইড বইয়ের দাম প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন প্রতিকূল অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও মেয়েরা দমে যায়নি। তাদের এই অদম্য জেদ আর হাড়ভাঙা খাটুনিই আজ ৮৮.৯৯% পাসের সাফল্যে রূপ নিয়েছে। অনেক দরিদ্র বাবা-মা তাদের আয়ের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% অংশ মেয়ের শিক্ষার জন্য ব্যয় করেছেন, যা আজ সার্থক হয়েছে।
বিদ্যালয়ের এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনে রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতির হার ছিল ৯৫% এরও বেশি। শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি দুর্বল ছাত্রীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি ছুটির দিনেও অনেক শিক্ষক অতিরিক্ত সময় দিয়ে ছাত্রীদের পড়া বুঝিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষকদের এই ১০০% আন্তরিকতা আর ছাত্রীদের মনোযোগের ফলেই শৈলকূপায় আজ পাইলট বালিকা বিদ্যালয় শীর্ষস্থানে উঠতে পেরেছে। শিক্ষকদের মতে, নিয়মশৃঙ্খলাই এই বিদ্যালয়ের মূল চাবিকাঠি যা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও এই বিদ্যালয়টি বিশেষ নজর দিয়েছে। এবার কারিগরি শাখা থেকে যে ২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তা এলাকায় নতুন করে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের মতে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারলে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে কারিগরি শাখার প্রতি ছাত্রীদের ঝোঁক গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বেড়েছে। স্কুলের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায়ও মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। এটি পুরো উপজেলার কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
ফলাফল প্রকাশের দিন স্কুল প্রাঙ্গণে দেখা গেছে এক আবেগঘন পরিবেশ। ছাত্রীরা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছে আর শিক্ষকরা তাদের মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করছেন। অনেক অভিভাবক খুশিতে কেঁদেও ফেলেছেন। তারা বলছেন, শৈলকূপা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি তাদের সন্তানদের স্বপ্ন দেখার জায়গা। মিষ্টির দোকানেও ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, সাফল্যের এই দিনে তারা প্রায় ৩০০$ ডলারের বেশি মূল্যের মিষ্টি বিতরণ করেছেন পুরো এলাকায়। সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, স্কুলের সাফল্যে সবাই সমানভাবে আনন্দিত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “আমাদের ছাত্রীরা উপজেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করায় আমি অত্যন্ত গর্বিত। এই সাফল্য আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল। আমরা চাই আগামী বছর পাসের হার ১০০% এ উন্নীত করতে এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ৫০ পার করতে।” তিনি আরও জানান, শিক্ষার মান উন্নয়নে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াবেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমগুলো ৮০% এর বেশি সময় সচল রাখা হচ্ছে যাতে ছাত্রীরা আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। এই ধরনের পরিকল্পনা আগামীতে আরও বড় সাফল্য বয়ে আনবে বলে সবাই বিশ্বাস করেন।
পরিশেষে বলা যায়, শৈলকূপা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আজ নারী শিক্ষার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল। মেধা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দিল যে, সুযোগ পেলে মেয়েরা যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। উপজেলার শীর্ষস্থানে থেকে তারা কেবল নিজের স্কুলের নয়, বরং পুরো জেলার নাম উজ্জ্বল করেছে। এখন এই ছাত্রীদের লক্ষ্য আরও বড় তারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের সেবা করতে চায়। সাফল্যের এই জয়গান শৈলকূপার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, যা আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
















