“ভোট দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার, উন্নয়নের শর্ত নয়”: রংপুরে ১১ এমপির কড়া প্রতিবাদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রংপুরের উন্নয়নকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সাথে গুলিয়ে ফেলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন এই অঞ্চলের নির্বাচিত জন প্রতিনিধিরা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রংপুর নগরের জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা সাফ জানিয়ে দেন, রংপুরের মানুষ কাকে ভোট দেবেন, সেটি তাদের একান্তই গণতান্ত্রিক অধিকার। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা একদলীয় শাসনেরই নামান্তর।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত মূল অভিযোগটি ছিল গত ৯ আগস্টের একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। সেদিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, রংপুরের মানুষ পিছিয়ে থাকার কারণ তারা ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। তার মতে, যখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকে তখন রংপুরের মানুষ জাতীয় পার্টি বা জামায়াতকে সমর্থন করে। মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অপমানজনক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। তারা বলেন, জনগণের ভোট কোনো সরকারের প্রতি দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি একটি নাগরিক অধিকার। উন্নয়নের সাথে ভোটের রাজনীতির এই শর্ত জুড়ে দেওয়া সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মির্জা ফখরুলের মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মুখে এমন কথা মানায় না। তিনি মনে করেন, রংপুরবাসীকে রাজনৈতিকভাবে অসচেতন ভাবাটা চরম ভুল। তিনি তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের বাজেটের একটি বড় অংশ আসে জনগণের করের টাকা থেকে। রংপুরের মানুষও সেই কর দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের কর রাজস্বের প্রায় ১০% থেকে ১২% উত্তরবঙ্গ থেকে এলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল সবসময়ই বৈষম্যের শিকার। সরকারের দায়িত্ব হলো দলমত নির্বিশেষে দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা, কোনো বিশেষ এলাকার মানুষকে রাজনৈতিক কারণে শাস্তি দেওয়া নয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রংপুর-১ এর রায়হান সিরাজী, রংপুর-৫ এর গোলাম রব্বানীসহ নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলার মোট ১১ জন সংসদ সদস্য। তারা বলেন, উত্তরবঙ্গে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। শিল্পায়নের অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকটে এই অঞ্চলের তরুণরা দিশেহারা। অথচ সরকারের মন্ত্রী উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত দিচ্ছেন। সংসদ সদস্যরা দাবি করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের (১ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না।

এমপিরা আরও বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো বহুত্ববাদ। একটি এলাকার মানুষ ভিন্ন আদর্শের অনুসারী হতেই পারে। তার মানে এই নয় যে, সেই এলাকার রাস্তাঘাট বা কলকারখানা হবে না। তারা অভিযোগ করেন, মন্ত্রীর এমন বক্তব্য আসলে একদলীয় শাসন কায়েমের মানসিকতা প্রকাশ করে। যদি উন্নয়নের জন্য শুধু সরকারি দলকেই ভোট দিতে হয়, তবে দেশে নির্বাচনের আর কোনো সার্থকতা থাকে না। তারা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তার এই বিতর্কিত বক্তব্য দ্রুত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান এবং রংপুরবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন।

রংপুরের উন্নয়নের প্রধান বাধাগুলো নিয়েও সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, রংপুরে গ্যাস সংযোগের অভাব এবং ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবার কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে। এখানকার প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কলকারখানা স্থাপন, তিস্তা সেচ প্রকল্পের আধুনিকায়ন এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন। এই দাবিগুলো পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব, কারণ সরকার চলে জনগণের টাকায়। তারা বলেন, জনগণের সমর্থন কোনো শর্তসাপেক্ষ বিষয় হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তা তারা যে দলকেই ভোট দিন না কেন।

সবশেষে, সংসদ সদস্যরা রংপুরবাসীকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তারা বলেন, ভয় দেখিয়ে বা উন্নয়নের লোভ দেখিয়ে মানুষের স্বাধীন চিন্তা কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আগামী দিনে এই অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই আরও জোরদার হবে। তারা সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রংপুরকে অবহেলিত রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিরপেক্ষ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কোনো অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করা হলে তার ফল শুভ হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্য সংসদ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নীলফামারীর আবদুস সাত্তার, আল ফারুক আব্দুল লতিফ, ওবায়দুল্লাহ সালাফী, আব্দুল মুনতাকিম এবং গাইবান্ধার মাজেদুর রহমান, আবদুল করিম, নজরুল ইসলাম ও আব্দুল ওয়ারেছ। তারা সম্মিলিতভাবে এই প্রতিবাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ