চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার স্বরূপনগর মহল্লায় সরকারি রাস্তা দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে বিশাল এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। তাদের দাবি একটাই অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তাটি দ্রুত মুক্ত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তাটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে হবে। মানববন্ধন শেষে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, শহরের নতুন বাস টার্মিনাল থেকে শুরু করে সিসিডিবি মোড় পর্যন্ত সরকারি এই রাস্তাটি কাগজ-কলমে প্রায় ৩০ ফুট চওড়া। কিন্তু বর্তমানে দখলদারদের দৌরাত্ম্যে রাস্তাটি গিলে ফেলেছে একদল প্রভাবশালী মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাস্তার প্রায় ৭০% থেকে ৮০% জায়গা এখন অবৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানের দখলে। এর ফলে রাস্তাটি এতটাই সরু হয়ে গেছে যে, পাশাপাশি দুজন মানুষের হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এই এলাকায় ঢুকতে পারছে না। এলাকার মানুষের মতে, রাস্তাটি দখল হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের জমির প্রকৃত দামও প্রায় ২০% কমে গেছে।
স্বরূপনগর এলাকাটি জেলা শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এখানে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজ, কারিগরি কলেজ, মোহর আলী উচ্চ বিদ্যালয় এবং তাজকেরাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো অন্তত ৪টি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। রাস্তা সরু হয়ে যাওয়ায় ছোটখাটো দুর্ঘটনা এখন এই এলাকার নিত্যদিনের চিত্র। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, গত দুই বছরে সরু রাস্তার কারণে যাতায়াত করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আহতের সংখ্যা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এই দখলের পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে। দখল করা সরকারি জায়গায় কেউ কেউ ঘর তুলে অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এলাকার প্রবীণদের মতে, দখল হয়ে থাকা এই সরকারি জমির বর্তমান বাজার মূল্য কয়েক কোটি টাকা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৩,৫০,০০০থেকে৪,০০,০০০ ডলারের সমান। অথচ এই বিশাল সরকারি সম্পদ ভোগ করছে মাত্র গুটিকয়েক মানুষ। তারা দাবি করেন, সরকারি সড়কের জায়গা দখল করে যারা বাড়ি করেছেন, তাদের অনেকেরই নিজস্ব জমি ও ঘর রয়েছে। স্রেফ লোভের বশবর্তী হয়ে তারা জনগণের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।
এর আগেও একবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় দখলদাররা নানা ধরনের রাজনৈতিক তদবির ও আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি মাঝপথে থামিয়ে দেয়। এলাকাবাসীর এবারের দাবি, উচ্ছেদ অভিযান যেন কোনোভাবেই মাঝপথে বন্ধ না হয় এবং তা ১০০% সফল করা হয়। তারা বলেন, “আমরা সরকারকে ট্যাক্স দেই, তাহলে কেন আমাদের যাতায়াতের জন্য কোনো সুপ্রশস্ত রাস্তা থাকবে না?” জনস্বার্থে এই অবৈধ স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাকিব, মো. আফজাল হোসেন, ও ওমর ফয়সালসহ আরও অনেকে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে যদি প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান শুরু না করে, তবে তারা আরও বড় আন্দোলনের ডাক দেবেন। প্রয়োজনে তারা ডিসি অফিস ঘেরাও বা রাস্তা অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি পালনে বাধ্য হবেন। এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি বন্ধ করার জন্য একটি চক্র প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে জোর লবিং চালাচ্ছে। তারা চান না সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করুক।
জেলা প্রশাসক স্মারকলিপি গ্রহণ করে এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকারি জায়গা উদ্ধারে প্রশাসন কোনো আপস করবে না। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এলাকাবাসী বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, তারা মাঠে উচ্ছেদের বাস্তবায়ন দেখতে চান। স্বরূপনগর মোড় থেকে শুরু করে পুরো এলাকাটি এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। রাস্তাটি দখলমুক্ত হলে এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থার অন্তত ৯০% উন্নয়ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, স্বরূপনগরের এই লড়াই শুধু একটি রাস্তার জন্য নয়, বরং সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াই। স্থানীয় বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শীঘ্রই তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তাটি ফিরে পাবেন এবং নিশ্চিন্তে যাতায়াত করতে পারবেন।
















