যশোর জেলা রাজনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের জেলা শাখার আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এই অনুমোদন আসায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। নতুন এই কমিটিতে মো. নূরুজ্জামানকে আহ্বায়ক এবং মো. মনিরুজ্জামান আজাদকে সদস্যসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। গত রবিবার কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়, যা যশোরের রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নতুন কমিটি আগামী ৬ মাস বা ১৮০ দিনের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাদের মূল লক্ষ্য হবে জেলার তৃণমূল পর্যায়ে দলটিকে শক্তিশালী করা। তবে একটি বিশেষ শর্তও জুড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই আংশিক কমিটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে কেন্দ্রে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ হাতে সময় খুব কম, মাত্র ১০০% সফলতার সাথে কাজ শেষ করতে হলে তাদের এখনই মাঠে নামতে হবে। দলের যশোর জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক সালমা আক্তার আশা এই কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং তিনি নতুন কমিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী।
কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও অভিজ্ঞ ও উদ্যমী ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে। ড. শহীদুল ইসলাম জাবিরকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে থাকছেন মো. শাহজাহান কবীর ও আসাদুজ্জামান বাবুল। তারা দুজনেই স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ। অন্যদিকে, সাংগঠনিক কাজে গতি আনতে ইঞ্জিনিয়ার আরিফ জামানকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব এবং সাজিদ সারোয়ার ও মো. বাদল উর রহমানকে যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নেতাদের আশা, এই সমন্বিত টিম যশোরের ৮টি উপজেলাতেই দলের অবস্থান অন্তত ৫০% শক্তিশালী করতে পারবে।
কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সালমা আক্তার আশা ও আব্দুল মতিন। বিশেষ করে, বর্তমান প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক’ নামে একটি বিশেষ পদ রাখা হয়েছে, যেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার বায়েজিদ হোসাইন। এই পদটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোতে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা ছিল অসামান্য। দল চাচ্ছে তাদের কমিটিতে অন্তত ৩০% তরুণ নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে, যাতে নতুন প্রজন্মের ভাবনাগুলো গুরুত্ব পায়।
যশোর জেলা এনসিপির এই নতুন নেতৃত্বকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমানে একটি রাজনৈতিক কার্যালয় পরিচালনা এবং সাংগঠনিক সফরের জন্য মাসে প্রায় ৪০০থেকে৫০০ ডলার সমপরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। এই খরচ মেটানো এবং সদস্যদের থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করা নতুন সদস্যসচিবের জন্য একটি বড় কাজ হবে। তবুও নেতাদের বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের সমর্থন থাকলে কোনো আর্থিক সংকটই তাদের পথ আটকাতে পারবে না। তারা চায় যশোরের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে শতভাগ নিবেদিত হয়ে কাজ করতে।
কমিটি ঘোষণার পর থেকেই যশোরের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, নূরুজ্জামান এবং আজাদের নেতৃত্বে এনসিপি যশোরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে আগামী ১৫ দিনের ওপর, যখন পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হবে। দলের নীতিনির্ধারকরা চাচ্ছেন কোনো রকম গ্রুপিং বা কোন্দল ছাড়াই একটি স্বচ্ছ কমিটি উপহার দিতে। এতে করে দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
বিগত কয়েক বছরে যশোরের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে অনেক ক্ষোভ রয়েছে। এনসিপি এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়। তারা টার্গেট নিয়েছে আগামী ৩ মাসের মধ্যে অন্তত ৫০০০ নতুন সদস্য সংগ্রহ করার। যদি তারা এই লক্ষ্যমাত্রার ৮০% অর্জন করতে পারে, তবে যশোরের রাজনীতিতে তারা বড় একটি জায়গা দখল করে নেবে। নতুন কমিটির আহ্বায়ক নূরুজ্জামান জানিয়েছেন, তারা কোনো বিভেদে বিশ্বাস করেন না, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান।
পরিশেষে বলা যায়, যশোরের এই নতুন কমিটি এখন সময়ের পরীক্ষায় অবতীর্ণ। কেন্দ্রীয় কমিটির দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং জেলাজুড়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করাই এখন তাদের প্রধান কাজ। যশোরের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে এই নতুন নেতৃত্বের দিকে। তারা কি পারবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে নতুন কিছু উপহার দিতে? সেই উত্তর পাওয়া যাবে আগামী কয়েক মাসের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
















