২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল হাতে আসার পর সারাদেশে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এক প্রকার দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৪.০৫ শতাংশে। ১৯ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৭ সালে পাসের হার একবার অনেক কমে গিয়েছিল, এরপর এবারই ফলাফলের এত বড় পতন দেখা গেল। গত বছরের তুলনায় পাসের হার শুধু কমেইনি, বরং সর্বোচ্চ সাফল্যের সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯,০০০ কমেছে। সোমবার (১০ আগস্ট) এই ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি এবং ইংরেজি-গণিতের দুর্বলতাই বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডে মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ‘শতভাগ ফেল’ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। গত বছর ৪৮টি প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস করেনি, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭টিতে। বিপুল সংখ্যক এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং বিদ্যালয়গুলোর শিখন মান এখন বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাসের হার কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। কুমিল্লা বোর্ড বাদে বাকি ৮টি শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০% এর নিচে নেমে গেছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার মাত্র ৬৭% আর সিলেটে ৬৯%। এমনকি ঢাকা বোর্ডেও গত বছর যেখানে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৮৮% ছিল, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮% এ। যেহেতু এই বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক, তাই কোনো ছাত্র এক বিষয়ে ফেল করলে তার পুরো ফলাফলই অকৃতকার্য হিসেবে গণ্য হয়েছে। শিক্ষকরা মনে করছেন, বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব ও গ্রামাঞ্চলে সঠিক গাইডেন্স না থাকায় শিক্ষার্থীরা এই দুই বিষয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও বড় ধরনের ব্যবধান চোখে পড়েছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। বিজ্ঞানের ছাত্ররা তুলনামূলক ভালো করলেও মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ৪১% এবং ছাত্রীদের ৫৪%। অথচ মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ লাখের ওপরে। এত বড় একটি অংশের ফল খারাপ হওয়ায় সামগ্রিক পাসের হার অনেক নিচে নেমে গেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো সহায়তা না থাকা এবং পড়াশোনায় অনীহা এই ফলাফলের জন্য দায়ী।
তবে এই খারাপ ফলাফলের মধ্যেও ছাত্রীরা তাদের সাফল্যের জয়গান গেয়েছে। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকে ছাত্ররা ছাত্রীদের কাছে পাত্তাই পায়নি। এবার ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮%, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ৬০%। জিপিএ-৫ পাওয়ার দৌড়েও মেয়েরা অনেক এগিয়ে। এবার মোট জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা ৫৮,০০০ এর বেশি, অন্যদিকে ছাত্ররা পেয়েছে ৪৭,০০০ এর কিছু বেশি। মেধা ও পরিশ্রমের ক্ষেত্রে মেয়েরা যে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে থাকছে, তা এই ফলাফলে আবার প্রমাণিত হলো।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। আর পাসের হারে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। পাসের হারে ধস নামার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক অনুষ্ঠানে বলেন, “মন খুলে গান গাওয়া যায়, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না।” মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো রকম শিথিলতা দেখানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনও জানিয়েছেন, উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করার কারণেই প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে।
সবশেষে বলা যায়, ৫ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় ধরনের দুর্বলতা আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার কঙ্কালসার অবস্থাকেই তুলে ধরছে। টানা ১০ বছর স্কুলে পড়ার পরও কেন এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী পাসের গণ্ডি পার হতে পারল না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শুধু পাসের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা কতটুকু বাড়ছে, তা যাচাই করা জরুরি। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়ার পরও কেন ফলাফল ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হলো, তা নিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিখন মান ও শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
















