সাঘাটায় জামায়াত আমিরের গর্জন: ‘ফ্যাসিবাদ রুখতে ২০২৪-এর মতো আবারও রাজপথে নামতে হবে’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধার সাঘাটা এখন এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে সাঘাটার বোনারপাড়া কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলার মাটিতে আর কোনো ফ্যাসিবাদীকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ক্ষমতার মোহ আর মানুষ হত্যার রাজনীতি এ দেশের মানুষ আর মেনে নেবে না। পরিস্থিতি যদি আবারও খারাপ হয়, তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মতো আমাদের আবারও রাজপথে নামতে হবে। ডা. শফিকুর রহমানের এই আহ্বানে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন।

সম্প্রতি সাঘাটায় সন্ত্রাসী হামলায় জামায়াত ও শিবিরের দুই কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি এবং দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবাদে এই জনসভার আয়োজন করা হয়। জামায়াত আমির তার বক্তব্যের শুরুতেই নিহত দুই কর্মীর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, “সাঘাটায় দুই তরুণ কর্মীকে হত্যা করে মা-বাবার বুক খালি করা হয়েছে। আমি আজ এখানে এসে সেই কান্নার সাক্ষী হয়েছি। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে ১০০% মানুষের জীবনের নিরাপত্তা থাকবে। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক। অথচ একটি গোষ্ঠী এখনো দখলের রাজনীতি আর হত্যার নেশায় মত্ত হয়ে আছে।”

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এখন চরম অবনতির দিকে। সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। অপরাধীদের দাপট যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, “একটি দেশ এভাবে চলতে পারে না। আমরা শান্তি চাই, কিন্তু সেই শান্তি যদি কেউ বিঘ্নিত করতে চায়, তবে আমরা তাকে ছেড়ে দেবো না। আপনারা সবাই প্রস্তুত হোন। ফ্যাসিবাদীরা যদি আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করে, তবে ৯৯% মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা রাজপথ দখল করব। যেভাবে ২০২৪ সালে সবাই অকুতোভয় হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, ঠিক সেভাবেই আমাদের আবারও ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”

বক্তব্যের এক পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি বর্তমান সরকারের বিশেষ কিছু মহলের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে কিছু মানুষ দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা মনে করছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, কিন্তু তারা জানে না যে জনগণের শক্তির কাছে সব অপশক্তিকে হার মানতে হয়। তিনি জানান, দেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন এবং তারা কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে দেবে না। তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান এবং দ্রুত খুনিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি তোলেন।

বোনারপাড়ার এই বিশাল জনসভায় সভাপতিত্ব করেন গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ। জনসভায় উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারা জামায়াত আমিরের ডাকে ঐক্যবদ্ধ। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, খুনিদের রক্ষা করার কোনো পথ আর খোলা নেই। এছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন তার বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দেন।

ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা। তিনি বলেন, ছাত্রসমাজ ২০২৪ সালে রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতা এনেছে, তা কোনোভাবেই বিফলে যেতে দেওয়া হবে না। তরুণ সমাজ আজ রাজপথে নামতে ভয় পায় না। এছাড়া গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিমসহ জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের জেলা ও উপজেলা নেতারা মঞ্চে উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন। সকাল থেকেই সাঘাটা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সাধারণ মানুষ অনুষ্ঠানস্থলে ভিড় করতে শুরু করেন। দুপুর হওয়ার আগেই পুরো মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

সবশেষে ডা. শফিকুর রহমান একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, কিন্তু অপরাধীদের ক্ষমা করাও হবে না। বাংলার প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে জামায়াত শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি রাজপথে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এই জনসভার মধ্য দিয়ে সাঘাটার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারের আশা জেগেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ