বিচারকের এজলাসে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ: চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বর পরিদর্শনে এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুল

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের আদালত পাড়ায় বিচারকের এজলাস ও খাস কামরায় নজিরবিহীন হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পর সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল বেলা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি সরাসরি যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক মো. উজ্জল মাহমুদের ক্ষতিগ্রস্ত এজলাস কক্ষ এবং তার খাস কামরা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে তিনি আদালতের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং উপস্থিত আইনজীবীদের সাথে কথা বলেন এবং পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত শোনেন। গত রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুরে আদালত চলাকালীন সময়ে এই হামলার ঘটনাটি ঘটে, যা পুরো জেলার বিচারিক পরিবেশে ১০০% আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় মূলত একটি সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে। জানা গেছে, রবিবার বেলা ১২টার দিকে আদালত কক্ষে বিদ্যুৎ ছিল না। সেই সময় বিচারক মো. উজ্জল মাহমুদ একটি মন্তব্য করেন, যা উপস্থিত আসামিপক্ষের লোকজন ও সমর্থকদের কানে ‘সরকারবিরোধী’ বা ‘কটূক্তিমূলক’ বলে মনে হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই কথা আদালত চত্বরের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতা একপর্যায়ে আদালতের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বিচারকের খাস কামরার দরজা-জানালার কাঁচ গুঁড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেই সময় আদালতের স্বাভাবিক কাজ প্রায় ৮০% বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। এই ঘটনার পর পুরো আদালত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল যখন আদালত পরিদর্শনে যান, তখন সেখানে ভাঙচুরের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। তিনি ভাঙা কাঁচ এবং লন্ডভন্ড আসবাবপত্র দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এমপি বুলবুল বলেন, “আদালত হচ্ছে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল এবং ন্যায়বিচারের এক পবিত্র পবিত্র জায়গা। এই পবিত্র জায়গায় যারা হামলা চালিয়েছে এবং বিচারকের কক্ষে ভাঙচুর করেছে, তারা কোনোভাবেই পার পাবে না। এ ধরনের ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত। আমরা কোনোভাবেই এমন বিশৃঙ্খলা বরদাশত করব না।” তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় জড়িতদের পেছনে যদি কোনো শক্তিশালী মহলও থাকে, তবুও তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের শাস্তির হার ১০০% নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে বিচারকরা নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন না।

এদিকে, বিচারকের অপসারণের দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদল একটি সংক্ষিপ্ত পথসভা থেকে চরম আল্টিমেটাম দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, একজন বিচারক হয়ে তিনি যে ধরনের মন্তব্য করেছেন তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ছাত্রদল নেতারা আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিচারক মো. উজ্জল মাহমুদের প্রশাসনিক বদলি ও অপসারণ দাবি করেছেন। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, যদি এই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে তারা আরও কঠোর আন্দোলনে যাবেন। এই আল্টিমেটামের ফলে আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মতে, বিচারকের কোনো মন্তব্য নিয়ে আপত্তি থাকলে তা উচ্চ আদালতে জানানো যেত, কিন্তু ভাঙচুর করা কোনো সমাধান নয়।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আবু হাসিব বিষয়টিকে আদালত প্রাঙ্গণে ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খল জনতা সৃষ্টির ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “আমাদের আদালতের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এজলাস কক্ষ ও খাস কামরায় কয়েক দফায় যে হামলা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তদন্ত কমিটি গঠন করে আসল দোষীদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।” আইনজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বিচারিক পরিবেশ নষ্ট হলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। প্রতিদিন শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আদালতে আসেন, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তারা ভয়ে মুখ খুলছেন না।

এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুল তার পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। তিনি বলেন, আদালতের এজলাসে যারা ভাঙচুর চালায়, তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তারা কেবলই অপরাধী। তিনি আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে আইনজীবী সমিতি ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। কোনো হট্টগোল বা পেশিশক্তির জোরে বিচারিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুশিয়ারি দেন।

সব মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত পাড়ায় এখন বিচারের চেয়ে উত্তেজনাই বেশি কাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, বিচারকের দেওয়া বক্তব্য এবং তার পরবর্তী হামলা—এই দুই বিষয়েরই গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। শুধুমাত্র গুজবের ওপর ভিত্তি করে আদালতের মতো জায়গায় হামলা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংসদ সদস্যের এই পরিদর্শন এবং কঠোর বার্তা দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আতঙ্ক কাটছে না। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই সংকট নিরসনে কত দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ