চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদেশি জাল নোটের কারখানার সন্ধান: বিপুল সরঞ্জামসহ ২ জালিয়াত আটক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের একটি নিরিবিলি এলাকার তিনতলা বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল বিদেশি জাল মুদ্রা তৈরির কারবার। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে, ভেতরে কী ভয়ংকর অপরাধ ডালপালা মেলছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গত শনিবার (৮ আগস্ট) দিবাগত রাতে র‍্যাবের একটি চৌকস দল ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জাল মুদ্রা তৈরির বিশাল কারখানার সন্ধান পেয়েছে। অভিযানে বিদেশি মুদ্রার ২৫ বান্ডিল জাল নোট এবং তা তৈরির বিপুল সরঞ্জামসহ দুই কারিগরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৫ এর সদস্যরা। এই ঘটনায় পুরো শহরজুড়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব জানতে পারে, শহরের আরামবাগ-বালুবাগান এলাকার একটি বাড়িতে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে। সেই খবরের ওপর ভিত্তি করে র‍্যাব-৫ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার হোসেন মাহমুদের নেতৃত্বে একদল সদস্য রাতভর অভিযান চালায়। অভিযানে তারা দেখেন, সাধারণ একটি বসতবাড়ির আড়ালে গড়ে তোলা হয়েছে জাল টাকার প্রেস। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৫ বান্ডিল জাল নোট জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত সরঞ্জামগুলোর মধ্যে ছিল উন্নত মানের কালার প্রিন্টার, বিশেষ ধরনের কাগজ, জলছাপ দেওয়ার কেমিক্যাল এবং কাটিং মেশিন। র‍্যাব জানায়, এই চক্রটি এতটাই নিখুঁতভাবে নোট তৈরি করত যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এগুলো আসল না নকল তা চেনা ১০০% অসম্ভব।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা এলাকার তসিকুল ইসলাম (মনিরুল ইসলামের ছেলে) এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শামীম আলী (সাইদুর রহমানের ছেলে)। র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া এই দুজনেই জাল মুদ্রা তৈরির দক্ষ কারিগর। তারা মূলত অর্ডারের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা যেমন ডলার ($), ইউরো এবং রিয়াল তৈরি করত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে যে, এই জাল নোটগুলো তারা আসল মুদ্রার মূল্যের মাত্র ১০% থেকে ১৫% দামে বাজারে সরবরাহ করত। অর্থাৎ, যদি ১০০ ডলারের জাল নোট তৈরি করা হতো, তবে তারা তা মাত্র ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি করে দিত।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার হোসেন মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, “আমরা খবর পেয়েছিলাম যে আরামবাগের এই তিনতলা বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে জাল নোট তৈরির আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা মূলত সীমান্ত এলাকা এবং বড় বড় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে এই জাল ডলার ($) ও রিয়াল সরবরাহ করত। জব্দ করা সরঞ্জামগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছিল। আমাদের এই অভিযানে শুধু কারিগররা ধরা পড়লেও মূল হোতা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ এখনো পলাতক রয়েছে। তাকে ধরতে আমাদের জাল বিছানো হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাড়ির ভেতরে যে এত বড় অপরাধের সিন্ডিকেট ছিল, তারা তা কল্পনাও করতে পারেননি। ওই এলাকায় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা থাকলেও তারা ভেবেছিলেন হয়তো কোনো ব্যবসার কাজে তারা আসছেন। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে বলছেন, যদি এই ২৫ বান্ডিল জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে পড়ত, তবে সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তেন। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো সীমান্ত জেলায় বিদেশি মুদ্রার ব্যাপক লেনদেন হয়, তাই জাল মুদ্রার সরবরাহ এখানকার অর্থনীতির জন্য ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

র‍্যাবের এই সফল অভিযানের পর এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। র‍্যাব কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন বড় অংকের ডলার বা অন্য কোনো মুদ্রা লেনদেনের সময় তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে যাচাই করে নেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন ছাড়া এই পর্যায়ের জাল নোট ধরা খুবই কঠিন। এই চক্রটি মূলত সহজ-সরল মানুষকে ঠকানোর জন্য এই পথ বেছে নিয়েছিল।

বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে সদর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ বলছে, তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই চক্রের সাথে আর কার কার যোগাযোগ আছে এবং তারা এ পর্যন্ত কত টাকার জাল মুদ্রা বাজারে ছেড়েছে, তার সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। এই সিন্ডিকেটটি মূলত ঢাকা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ