মোঃ মিনারুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের একটি অবৈধ তৎপরতা রুখে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত রোববার (০৯ আগস্ট) সকালে জীবননগরের মাধবখালী সীমান্ত দিয়ে তিনজনকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবি জওয়ানরা সীমান্তে ১০০% সজাগ থাকায় বিএসএফের সেই ‘পুশইন’ পরিকল্পনা সফল হতে পারেনি। এই ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা আর আতঙ্ক বিরাজ করলেও বিজিবির কড়া পাহারায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় বিজিবি তাদের টহল আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানমলে দেখা যায়, রোববার ভোররাত থেকেই মাধবখালী সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশে বিএসএফের সন্দেহজনক আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল। সকাল হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ৩২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মেতেরী ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্তের ৭০/২-এস পিলারের কাছে চলে আসে। তারা ভারতের কাঁটাতারের বেষ্টনীর একটি গেট খুলে একজন পুরুষ ও দুইজন নারীকে জোর করে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা চালায়। বিএসএফ সদস্যরা তাদের একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে পাঠিয়ে দেয়। তবে বিজিবি সদস্যরা আগে থেকেই সেখানে পাহারায় থাকায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং তাদের অবৈধ প্রবেশে বাধা দেয়।
বিজিবি সূত্র জানায়, বিএসএফ যখন তাদের পুশইনের চেষ্টা করছিল, তখন বিজিবি জওয়ানরা জিরো লাইনে শক্ত অবস্থান নেয়। বিজিবির এমন অনড় অবস্থানের মুখে বিএসএফ সদস্যরা কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর ওই তিন ব্যক্তি জিরো লাইন থেকে প্রায় ৪০ গজ ভারতের ভেতরে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলে। অবশেষে বিজিবি কোনোভাবেই তাদের ঢুকতে দেবে না বুঝতে পেরে বিএসএফ সদস্যরা আবার ৬৮/৫-এস পিলারের কাছের গেটটি খুলে তাদের নিজেদের সীমান্তের ভেতরে নিয়ে যায়। বিজিবির এই সাহসিকতায় বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই খবরটি জানাজানি হওয়ার পর মহেশপুর-৫৮ বিজিবির পক্ষ থেকে একটি জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে সহকারী পরিচালক মুন্সী ইমদাদুর রহমান পরিষ্কার করে জানান যে, সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন ঠেকাতে বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখছি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর অনুপ্রবেশ বন্ধে আমাদের সদস্যরা ১% ছাড়ও দিতে রাজি নয়। আমরা বিএসএফকে জানিয়ে দিয়েছি যে, এভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।”
সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, ভারত থেকে মাঝেমধ্যেই এভাবে রাতের অন্ধকারে কিংবা ভোরে লোক পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। এতে করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে চুরি, ডাকাতি কিংবা চোরাচালান বাড়ার ভয় থাকে। স্থানীয় একজন কৃষক বলেন, “বিজিবি যদি সেদিন কড়া না হতো, তবে ওই তিনজনকে আমাদের এলাকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। আমরা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি কখন কারে পাঠায় দেয়।” সীমান্ত এলাকায় অবৈধ চোরাচালান বন্ধে বিজিবি প্রতি বছর গড়ে ৫০০,০০০ ডলারের বেশি মূল্যের অবৈধ পণ্য এবং মাদক উদ্ধার করে থাকে। এবারের পুশইন চেষ্টার পেছনেও কোনো অসাধু চক্রের হাত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
বর্তমানে মাধবখালী সীমান্তসহ চুয়াডাঙ্গার পুরো সীমান্তজুড়ে বিজিবির টহল দল দিনরাত কাজ করছে। বিজিবি কমান্ডিং অফিসাররা নিয়মিত সীমান্ত পরিদর্শন করছেন যাতে কোনোভাবেই নিরাপত্তার ফাঁক গলে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে কুয়াশা আর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিএসএফ যাতে এ ধরনের কোনো কাজ করতে না পারে, সেজন্য আধুনিক সব সরঞ্জাম ব্যবহার করছে বিজিবি। সীমান্তে বিএসএফের এই অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে এরই মধ্যে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে।
সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন, ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও সীমান্তে বিএসএফের এমন কর্মকাণ্ড মোটেই কাম্য নয়। এভাবে জোর করে কাউকে পুশইন করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তবে বিজিবি যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে এলাকার মানুষ এখন অনেকটা স্বস্তিতে আছেন। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে এবং অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আপাতত বিজিবির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে ভারতের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
















