হরিণাকুণ্ডুর ওসি (তদন্ত)অসিত রায়ের অতীত নিয়ে তোলপাড়: গুম মামলার আসামি এখন দণ্ডমুণ্ডর কর্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানার বর্তমান ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায়কে নিয়ে পুরো এলাকায় এখন চরম অস্বস্তি আর আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন ১০০০টি প্রশ্ন একজন গুম মামলার আসামি কীভাবে থানার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে বিচার কাজ পরিচালনা করছেন? অভিযোগ উঠেছে, এই পুলিশ কর্মকর্তা ২০১৩ সালে কুমিল্লার লাকসামের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু এবং বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির পারভেজকে গুম করার আলোচিত ঘটনার অন্যতম প্রধান কারিগর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে, সেই ব্যক্তি হরিণাকুণ্ডু থানায় বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করায় গত ৯ আগস্ট থেকে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট বুঝতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর। সেই দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিট। সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু এবং তার সহকর্মী হুমায়ুন কবির পারভেজ একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার লাকসাম থেকে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় কুমিল্লার হরিশ্চর এলাকা থেকে তাদের তুলে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ রাতে পুরো লাকসাম শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এক ভয়ংকর অন্ধকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন র‍্যাব-১১-এর এসআই হিসেবে কর্মরত অসিত কুমার রায় এই অপহরণ মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ আছে। আজ দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দুই নেতার কোনো খোঁজ পায়নি তাদের পরিবার।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালের সেই সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। শুধুমাত্র নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই সারাদেশে র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে প্রায় ২০৮ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছিলেন। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে ১৩৭ জনকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ক্রসফয়ারের নামে সরাসরি হত্যা করা হয়। বাকি যারা গুম হয়েছিলেন, তাদের ১০০% মানুষ আজও নিখোঁজ। এই ভয়ংকর অপরাধযজ্ঞের সাথে জড়িত থাকার জোরালো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অসিত কুমার রায়ের ক্যারিয়ারে কোনো আঁচ লাগেনি। ক্ষমতার পালাবদলে অনেক কিছু পাল্টালেও তিনি এসআই থেকে পদোন্নতি পেয়ে আজ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে বসে দাপট দেখাচ্ছেন।

নিখোঁজ সাইফুল ইসলাম হিরু’র ছেলে রাফসানুল ইসলাম তার বাবার ফেরার অপেক্ষায় আজও প্রহর গুনছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বাবাকে যখন তুলে নেওয়া হয়, তখন আমরা থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। র‍্যাব-১১-এর কার্যালয়ে গিয়ে তৎকালীন বড় কর্মকর্তাদের হাতে-পায়ে ধরেছি, কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি। পরে আমরা আদালতে মামলা করতে বাধ্য হই। যে মানুষটি আমার বাবাকে গুম করার সময় উপস্থিত ছিল, সেই অসিত রায় আজ পুলিশের বড় কর্মকর্তা হিসেবে তদন্তের দায়িত্ব পালন করছেন! আমরা এর বিচার কার কাছে দেব?” রাফসানুল আরও জানান, দীর্ঘ ১ দশক ধরে তারা মানবাধিকার সংস্থা থেকে শুরু করে সব জায়গায় ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি।

বর্তমানে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি (তদন্ত) হিসেবে অসিত রায়ের অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ৯৯% সন্দেহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একজন মানুষ যার নিজের বিরুদ্ধেই অপহরণ ও গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার চলছে, তার কাছ থেকে সাধারণ মানুষ কীভাবে ন্যায়বিচার আশা করবে? প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন কর্মকর্তাদের দাপট দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ রীতিমতো তটস্থ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলাকালীন কোনো আসামিকে এমন স্পর্শকাতর পদে রাখা আইনত ও নৈতিকভাবে কতটা সঠিক, তা নিয়ে সুশীল সমাজ বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়ায় অসিত রায়ের মতো ব্যক্তিরা বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, এই পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে অভ্যস্ত। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর মানুষ এখন আতঙ্কে আছেন যে, তাদের এলাকায় কোনো বিপদ হলে তারা পুলিশের কাছে গিয়ে নিরাপদ বোধ করবেন কি না। এই বিতর্কিত কর্মকর্তার দ্রুত প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে চলা মামলার সঠিক তদন্ত এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।

সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে পুলিশের ওপর থেকে মানুষের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। যেখানে সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার কথা বলছে, সেখানে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে থানার দণ্ডমুণ্ডর কর্তা বানিয়ে রাখা প্রশাসনের জন্য বড় কলঙ্ক। হরিণাকুণ্ডুর সাধারণ মানুষ এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন যাতে এই ‘অলক্ষুণে শক্তিকে’ আইনের আওতায় আনা হয়। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের কান্না আর আহাজারি থামবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু আপাতত হরিণাকুণ্ডু থানায় এই পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে তোলপাড় থামছেই না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ