রিণাকুণ্ডুর কুলবাড়ীয়া বাজারের সেই অভিশপ্ত সড়কের সংস্কার শুরু: জনমনে স্বস্তি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মো. খলিলুর রহমান, হরিণাকুণ্ডু: ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কুলবাড়ীয়া বাজার এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের এক বড় কষ্টের নাম ছিল স্থানীয় প্রধান সড়কটি। সামান্য বৃষ্টি হলেই যেখানে হাঁটু সমান কাদা আর বড় বড় গর্তে পানি জমে থাকত, সেখানে অবশেষে সংস্কারের ছোঁয়া লেগেছে। গত সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বাজার থেকে মান্দিয়া রোড পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকা এই রাস্তাটির কাজ শুরু হওয়ায় এলাকার ৫,০০০ মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুলবাড়ীয়া বাজারের এই রাস্তাটি গত ৩-৪ বছর ধরে চলাচলের একদম অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। রাস্তার ১০০% অংশই ছিল ভাঙাচোরা। বড় বড় গর্তের কারণে রিকশা, ভ্যান এমনকি মোটরসাইকেল চলতেও হিমশিম খেত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, খানাখন্দের কারণে বাজারে ক্রেতা আসা প্রায় ৪০% কমে গিয়েছিল। প্রতিদিন শত শত মানুষকে এই কাদা-পানি মাড়িয়ে বাজারে আসতে হতো। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন টানা বৃষ্টি হতো, তখন সড়কটি ছোটখাটো একটি খালে পরিণত হতো। এই জনদুর্ভোগ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন।

রাস্তার এই করুণ দশা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টালে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একইসাথে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় যুবকরা রাস্তার বেহাল দশার ছবি পোস্ট করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পর বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপরই টনক নড়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের। খবরটি সামাজিক মাধ্যমে প্রায় ২,০০০ বার শেয়ার হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের ভাষা আরও জোরালো হয়।

জনগণের এই ন্যায্য দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তাইজাল হোসেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপনের সাথে আলোচনা করে দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। ইউএনও প্রদীপ্ত রায় দীপন নিজে বিষয়টি তদারকি করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। সোমবার সকাল থেকে শ্রমিকরা যখন ইট ও খোয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন বাজারের ব্যবসায়ীরা মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ প্রকাশ করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রহিম মিয়া বলেন, “আমাদের এই ২০০ মিটার রাস্তা যেন ২০০ কিলোমিটারের সমান কষ্ট দিচ্ছিল। আমরা সারাদিন দোকানে বসে থাকতাম কিন্তু কাদার ভয়ে কাস্টমার আসত না। আজ কাজ শুরু হয়েছে দেখে খুব ভালো লাগছে। আশা করছি এবার আমাদের ব্যবসার অন্তত ২০-৩০% উন্নতি হবে।” অন্যদিকে, স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যেত। এখন রাস্তা ঠিক হলে তারা নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারবে।

উপজেলা প্রশাসনের সূত্র মতে, এই জরুরি সংস্কার কাজে প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যাতে আপাতত মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন হয়। সংস্কার কাজে ব্যবহৃত ইটের মান এবং খোয়ার পরিমাণ যাতে ঠিক থাকে, সেদিকে স্থানীয় সচেতন মহল কড়া নজর রাখছেন। তারা বলছেন, শুধুমাত্র জোড়াতালি না দিয়ে যেন টেকসইভাবে রাস্তাটি মেরামত করা হয়। এই সংস্কার কাজ শেষ হলে কুলবাড়ীয়া বাজার থেকে মান্দিয়া অভিমুখে যাতায়াতকারী অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের কষ্ট চিরতরে দূর হবে।

বাজার কমিটির নেতারা জানান, সড়কটি ভালো থাকলে এখানে প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা থাকলে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকে সবজি চাষিরা সহজেই তাদের পণ্য বাজারে আনতে পারবেন। বর্তমানে সংস্কার কাজ চলায় সাময়িকভাবে যান চলাচলে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও সাধারণ মানুষ তা হাসিমুখে মেনে নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, কয়েক দিনের এই সাময়িক কষ্ট ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী আরাম বয়ে আনবে।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তাইজাল হোসেন জানান, জনদুর্ভোগ লাঘব করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, “আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। এই সড়কটির কারণে মানুষ যে কষ্ট পেয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সংবাদপত্রের মাধ্যমেই আমরা সমস্যার গভীরতা বুঝতে পেরেছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি।” আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই কাজের ফলে বাজার এলাকার পরিবেশ যেমন সুন্দর হবে, তেমনি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ