একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতি গঠনে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানুষের মানসিক বিকাশ এবং তরুণ সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে ক্রীড়াঙ্গনের ভূমিকা অপরিসীম। ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উপজেলা শৈলকুপা একসময় খেলাধুলার জন্য বেশ সুপরিচিত ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এবং সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখানকার ক্রীড়াঙ্গন অনেকটা জৌলুস হারিয়ে ফেলেছিল। মাঠগুলো ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা যেত এবং তরুণরা খেলাধুলার বদলে ডিজিটাল স্ক্রিন বা বাজে আড্ডায় সময় নষ্ট করত। তবে শৈলকুপার সাধারণ মানুষ এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য সম্প্রতি একটি অত্যন্ত আনন্দের খবর সামনে এসেছে। শৈলকুপার ক্রীড়ার সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে সম্প্রতি এক ফলপ্রসূ আলাপচারিতায় মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রীর এই বৈঠক শৈলকুপার ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, তাদের এই আলোচনা শৈলকুপার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
শৈলকুপার ক্রীড়াঙ্গনের অতীত ও বর্তমান চিত্র
একটা সময় ছিল যখন শৈলকুপার প্রতিটি গ্রামের মাঠে শীতকালে বা বর্ষায় জমজমাট ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হতো। গ্রামের মেঠো পথ ধরে মানুষ দল বেঁধে খেলা দেখতে যেত। অ্যাথলেটিকস, কাবাডি বা ভলিবলেও শৈলকুপার ছেলেদের বেশ নামডাক ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক খেলার মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে বা বেদখল হয়ে গেছে। স্থানীয় স্কুল-কলেজের মাঠগুলোতেও আগের মতো সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সঠিক কোচিং, খেলার সরঞ্জাম এবং প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের অভাবে এখানকার অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় অকালেই ঝরে পড়ছে। এই স্থবিরতা দূর করতে একটি বড় ধরনের সরকারি উদ্যোগের খুব প্রয়োজন ছিল।
দুই মন্ত্রীর ফলপ্রসূ আলাপচারিতা ও নতুন আশার সঞ্চার
শৈলকুপার ক্রীড়াঙ্গনের এই বেহাল দশা দূর করতে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি নিজ এলাকার মানুষের নাড়ির স্পন্দন বোঝেন। তরুণদের মাঠমুখী করতে তিনি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামের সাথে শৈলকুপার ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও এই বিষয়ে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। যখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুজন মন্ত্রী একটি নির্দিষ্ট উপজেলার ক্রীড়া উন্নয়ন নিয়ে একসাথে বসেন ও পরিকল্পনা করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় ভরসার জায়গা তৈরি হয়। এই আলাপচারিতা প্রমাণ করে যে, শৈলকুপার ক্রীড়াঙ্গন আর অবহেলিত থাকবে না।
আধুনিক স্টেডিয়াম ও মাঠ সংস্কারের উদ্যোগ
যেকোনো এলাকায় খেলাধুলার প্রসারের জন্য সবচেয়ে আগে প্রয়োজন একটি ভালো মাঠ বা স্টেডিয়াম। শৈলকুপায় একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়ামের দাবি দীর্ঘদিনের। আইনমন্ত্রী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর আলোচনায় শৈলকুপার কেন্দ্রীয় মাঠের সংস্কার এবং একটি আধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। উপজেলা পর্যায়ের মাঠগুলোতে যদি ভালো গ্যালারি, ড্রেসিংরুম এবং সারা বছর খেলার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা যায়, তবে খেলোয়াড়রা অনেক বেশি উৎসাহিত হবে। শুধু কেন্দ্রীয় মাঠ নয়, প্রতিটি ইউনিয়নের স্কুল-কলেজের মাঠগুলোকেও সংস্কার করে খেলার উপযোগী করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিশাল পরিবর্তন আসবে।
তৃণমূল থেকে নতুন প্রতিভা অন্বেষণের পরিকল্পনা
আমাদের গ্রামের কাদামাটির মাঝেই লুকিয়ে আছে আসল প্রতিভা। সুযোগের অভাবে তারা হয়তো জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম বরাবরই তৃণমূল থেকে প্রতিভা তুলে আনার ওপর জোর দিয়ে আসছেন। শৈলকুপার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। দুই মন্ত্রীর আলাপচারিতায় উঠে এসেছে শৈলকুপার গ্রামগঞ্জ থেকে ট্যালেন্ট হান্ট বা প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির কথা। ভালো মানের কোচ নিয়োগ দিয়ে বাছাইকৃত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে শৈলকুপা থেকে আগামী দিনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য অনেক ভালো মানের খেলোয়াড় তৈরি হওয়া সম্ভব।
তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষার ঢাল
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যাধি হলো মাদক এবং কিশোর গ্যাং। তরুণ সমাজ যখন খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যায়, তখনই তারা এই ধরনের বিপথে পা বাড়ায়। আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যেমন কঠোর, তেমনি তিনি খুব ভালোভাবে জানেন যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করতে হলে তরুণদের মাঠে ফেরাতে হবে। খেলাধুলা হলো মাদক থেকে তরুণদের দূরে রাখার সবচেয়ে বড় ও কার্যকরী ঢাল। শৈলকুপার মাঠে মাঠে যখন আবার টুর্নামেন্ট শুরু হবে, তখন তরুণরা বাজে আড্ডা ছেড়ে খেলার অনুশীলনে ব্যস্ত থাকবে। এতে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমবে এবং একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকবে।
মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ
খেলাধুলায় এখন আর শুধু ছেলেরাই সীমাবদ্ধ নেই, বাংলাদেশের মেয়েরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ সাফল্য বয়ে আনছে। নারী ফুটবল ও ক্রিকেটে আমাদের দেশের মেয়েদের অর্জন আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। শৈলকুপার ক্রীড়া উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আইনমন্ত্রী এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর আলোচনায় মেয়েদের জন্য নিরাপদ খেলার পরিবেশ তৈরি ও তাদের উৎসাহিত করার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই স্থান পেয়েছে। গ্রামের মেয়েদের জন্য আলাদা টুর্নামেন্ট ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে শৈলকুপার মেয়েরাও খেলাধুলায় সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়তে পারবে এবং দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যেন দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়
আমরা অনেক সময়ই দেখি যে, বড় বড় আলোচনা বা প্রতিশ্রুতির পর তা লাল ফিতায় আটকে যায়। তবে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামের মতো ডায়নামিক ও কর্মঠ নেতাদের ক্ষেত্রে আমরা এমনটি আশা করি না। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কবে এই আলাপচারিতার সুফল বাস্তবে দেখা যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, খুব দ্রুতই শৈলকুপায় মাঠ সংস্কারের কাজ শুরু হবে এবং নিয়মিত টুর্নামেন্টের জন্য সরকারি বরাদ্দ পৌঁছাবে। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও উচিত মন্ত্রীদের এই উদ্যোগের সাথে একাত্ম হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপার ক্রীড়ার উন্নয়ন নিয়ে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামের এই আলাপচারিতা শৈলকুপাবাসীর জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আনন্দের মুহূর্ত। এটি শুধু খেলাধুলার উন্নয়ন নয়, বরং একটি সুস্থ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত শৈলকুপা গড়ার একটি বড় পদক্ষেপ। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শৈলকুপার মাটি থেকেই একদিন বিশ্বমানের অ্যাথলেট তৈরি হবে, যারা দেশের লাল-সবুজ পতাকাকে বিদেশের মাটিতে উঁচিয়ে ধরবে। আমরা বিশ্বাস করি, দুই মন্ত্রীর এই আন্তরিক প্রচেষ্টা খুব দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে এবং শৈলকুপার প্রতিটি খেলার মাঠ আবারও তরুণদের পদচারণায় ও দর্শকদের উল্লাসে মুখরিত হয়ে উঠবে। শৈলকুপার ক্রীড়াঙ্গনের এই নতুন যাত্রাপথ সফল হোক, এটাই আমাদের সবার প্রাণের প্রত্যাশা।
















