ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এক বিশাল অভিযান শুরু করেছে। গত ১ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে পুলিশ ১৮ জন মাদক কারবারি ও সেবীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে। ঝিনাইদহ জেলার মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই সক্রিয় ভূমিকা এখন এলাকার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। শৈলকুপা থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই এক সপ্তাহের পৃথক অভিযানে ৩১৯ পিস ইয়াবা এবং ৫০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৮টি আলাদা মামলা দায়ের করেছে।
শৈলকুপার পুলিশ এই অভিযানে কোনো প্রকার আপস না করার নীতি গ্রহণ করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা টহল দিচ্ছে পুলিশের বিশেষ দল। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা শৈলকুপাকে ১০০% মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে থানা প্রশাসন। এই এক সপ্তাহের অভিযানে পুলিশের নজরদারি আগের চেয়ে অন্তত ৫০% বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে একে একে অপরাধীরা ধরা পড়ছে।
অভিযানের শুরুতেই কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে আসা তিন যুবককে আটক করে পুলিশ। তারা হলেন—জান্নাত শেখ (২৪), রাশেদ খুনকার (২৫) এবং মিথুন (২৯)। ৬ নং সারুটিয়া ইউনিয়নের বড়ুলিয়া গ্রামের নদীর পাড় থেকে ৪৮ পিস ইয়াবাসহ পুলিশ তাদের পাকড়াও করে। পুলিশ জানিয়েছে, বাইরের জেলা থেকে এসে শৈলকুপায় মাদক সরবরাহ করার চেষ্টা করলে তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া যশোরের কেশবপুর থেকে আসা ফারহান তানভীর (২২) নামের এক যুবককেও ৩৫ পিস ইয়াবাসহ মালিপাড়া গ্রাম থেকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
গত ৭ আগস্ট দুপুরে শৈলকুপার ৭ নং হাকিমপুর ইউনিয়নের পূর্ব মাদলা গ্রামে এক চাঞ্চল্যকর অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ৪৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় ইমন হোসেন ওরফে কাজল (২১) ও সোহান হোসেন (২৪)। তারা দুজনেই খালকুলা গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন ছোট ছোট দোকানের আড়ালে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছে। ওই দিন রাতেই পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া থেকে আরও ৩১ পিস ইয়াবাসহ রাকিব ইসলাম (১৯) ও শিগন মিয়াকে (২১) পুলিশ আটক করে। এদের আটক করার সময় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
কেবল ইয়াবা নয়, গাঁজা উদ্ধারেও পুলিশ বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় সারুটিয়া ইউনিয়নের তালতলা বাজারের ব্রিজের ওপর থেকে রশিদ মন্ডল (৫০) ও আক্তার শেখ (৬০) নামে দুই ব্যক্তিকে ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেফতার করা হয়। বয়স্ক ব্যক্তিদের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয়রা হতবাক হয়ে পড়েছেন। এছাড়া ১৫ নং ফুলহরি ইউনিয়নের ভগবান নগর গ্রাম থেকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ বিপুল মন্ডল (৪০) এবং রয়েড়া গ্রাম থেকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ ইমন শেখ (৩৫) নামে দুই ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করেছে। পুলিশ মনে করছে, এই অভিযানে মাদকের সরবরাহ অনেকখানি কমে আসবে।
মাদক বিরোধী এই অভিযানে কেবল সাধারণ মামলা নয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজাও দেওয়া হচ্ছে। গোসাইডাঙ্গা গ্রামের রুবেল শেখ (২৮) নামের এক যুবককে মাত্র ১ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সাথে তাকে ১০০০ টাকা বা প্রায় ১০$ (ডলার) সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হয়। এই কঠোর সাজা দেখে এলাকার অন্যান্য মাদকসেবীদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, মাদক সেবনের হার ১০% এ নামিয়ে না আনা পর্যন্ত তারা থামবে না।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সমাজের অন্তত ৩০% শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই মাদকের উৎসগুলো বন্ধ করতে পুলিশ এখন থেকে আরও কঠোর হবে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি গ্রাম ও পাড়ায় সোর্সের মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষকেও আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা মাদক সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করেন।
সব মিলিয়ে শৈলকুপায় পুলিশের এই এক সপ্তাহের বিশেষ অভিযান ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উদ্ধারকৃত ৩১৯ পিস ইয়াবা এবং আধা কেজি গাঁজা ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। এলাকাবাসী পুলিশের এই বীরত্বপূর্ণ কাজকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, আগামী দিনে শৈলকুপায় আর কোনো মাদকের আস্তানা থাকবে না। পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকলে ঝিনাইদহ জেলা খুব শীঘ্রই একটি আদর্শ ও নিরাপদ জনপদে পরিণত হবে বলে সবাই বিশ্বাস করেন।
















