সবকিছুর শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে, অনেকটা আকস্মিকভাবে। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে তখন ‘ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া’ চলছিল। সেখানে বেড়াতে গিয়েই ওয়াকার এ খান প্রথম ব্রিটিশ ভারত ও তৎকালীন দেশীয় রাজ্যগুলোর কিছু চমৎকার ভিন্টেজ বা প্রাচীন আলোকচিত্র দেখতে পান। সেই প্রদর্শনীতে একটি রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত প্রাচীন মহারাজার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। সেই মুহূর্তেই তার মাথায় একটি প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশেও কি এমন প্রাচীন ছবিগুলো খুঁজে বের করা, সেগুলো উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা সম্ভব? সেই থেকে শুরু হওয়া এক নেশা আজ তাকে নিয়ে গেছে ইতিহাসের এক গভীর গহ্বরে।
তবে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া বেশ আর্দ্র। এই জলবায়ু যেকোনো পুরনো কাগজ বা ছবির স্থায়িত্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ওয়াকার এ খান ভালো করেই জানতেন যে, সংরক্ষণের অভাবে এখানকার অন্তত ৯০% প্রাচীন ছবি এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও তিনি দমে যাননি। প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় পর, ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব দুষ্পাপ্য ছবি সংগ্রহের কাজে হাত দেন। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে একে একে উদ্ধার করেন হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের টুকরোগুলো।
ওয়াকার এ খান যখন এসব ছবি সংগ্রহ শুরু করেন, তখন তিনি এক করুণ চিত্র দেখতে পান। অধিকাংশ ছবিই অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল। ছবিগুলোর প্রায় ১০০% ই ছিল কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মালিকদের অসচেতনতাই ছিল এর প্রধান কারণ। অনেকেই জানতেন না যে সাধারণ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করলে এসব ছবি রক্ষা করা যেত। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও তিনি দেখেছেন চরম অবহেলা। অথচ সামান্য যত্নে অনেক অমূল্য ছবি আজ আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকতে পারত। তার এই অক্লান্ত পরিশ্রম অবশেষে আলোর মুখ দেখে ২০০৩ সালে, যখন তিনি ‘রেয়ার ফটোগ্রাফস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল (১৮৮০-১৯৪০)’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন।
এই বইটিতে ১২২টি অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ছবি স্থান পেয়েছে, যা আমাদের ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা বলে। বইটিতে ১৯৩৩ সালে ক্যালকাটায় তোলা শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং স্যার খাজা নাজিমুদ্দিনের অসামান্য কিছু পোর্ট্রেট রয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯০১ সালের একটি বিরল ছবিও তিনি উদ্ধার করেছেন। এসব ছবি কেবল কাগজের টুকরো নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের জলজ্যান্ত দলিল। ওয়াকার এ খান নিজেকে আলোকচিত্রী না বললেও, ছবিকে শিল্পের একটি উচ্চতর মাধ্যম হিসেবে দেখেন এবং এর ঐতিহাসিক মূল্যকে তুলে ধরতে চান।
বর্তমানে ওয়াকার এ খান একটি অত্যাধুনিক ‘ভিন্টেজ ফটো আর্কাইভ’ এবং ওয়েবসাইট তৈরির পরিকল্পনা করছেন। তিনি মনে করেন, এটি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার হবে। বিশেষ করে যারা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এখান থেকে ১০০% সঠিক ভিজ্যুয়াল তথ্য পাবেন। ছবিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, একজন আলোকচিত্রী যখন ছবি তোলেন, তখন তিনি সাধারণত কোনো বিতর্ক সৃষ্টির জন্য তা করেন না। তাই ইতিহাসবিদদের উচিত হবে না এই ছবিগুলোর ওপর অযথা কোনো কঠিন তত্ত্ব চাপিয়ে দেওয়া। বরং এগুলোকে সে সময়ের বাস্তবতা হিসেবেই দেখা উচিত।
আমাদের দেশে ছবি সংরক্ষণের বিষয়টি এখনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব পায় না। অথচ পেইন্টিং বা ড্রয়িং সংগ্রহের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। সারাবিশ্বের জাদুঘরগুলোতেও ছবির সংগ্রহ অন্যান্য শিল্পের তুলনায় মাত্র ৫% থেকে ১০% এর বেশি নয়। ওয়াকার এ খান বিশ্বাস করেন, প্রতিটি ছবির পেছনে একটি আলাদা গল্প লুকিয়ে থাকে। তিনি সেই হারানো স্মৃতিগুলোকে জোড়া লাগিয়ে অতীতকে বর্তমানের সামনে তুলে ধরতে চান। তার কাছে এই কাজের সন্তুষ্টি অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি। তিনি চান, এই অমর ছবিগুলো নিজেই নিজের কথা বলুক এবং পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের শেকড়ের সন্ধান দিক।
















