চাঁপাইনবাবগঞ্জে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত: সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে ৭ দফা পেশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো এবং জীবন ও সুস্থতার সুরক্ষায় তাদের বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি প্রদান। গত রোববার (৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের আয়োজনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এই দিনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শত শত মানুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশের পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার আদায়ের দাবি জানান।

শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে এক বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। এই মিছিলে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন মানুষ অংশ নেন, যার মধ্যে অন্তত ৪০% ছিলেন নারী ও আদিবাসী তরুণ প্রজন্ম। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক যেমন—উদয়ন মোড়, নিউমার্কেট, সেন্টু মার্কেট এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে প্রদক্ষিণ করে। রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে মিছিলটি যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা ডিসি অফিস চত্বরে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আদিবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল ও সংহতি তৈরি করে।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সেক্রেটারি এবং সদর উপজেলার পারগানার সভাপতি কর্নেলিয়াস মুরমু। তার সাথে সংহতি জানিয়ে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রদীপ হেমব্রম, যুবনেতা সিপোনেন মেহব্রুম এবং সম্পাদিকা মলিকা সরণ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এনজিও ম্যানেজার ও সমাজকর্মী নিকোলাস মুরমু, আদিবাসী কোল নেত্রী কল্পনা কোল মুরমু এবং রেডিও মহানন্দার স্টেশন মাস্টার রেজাউল করিম টুটুল। বক্তারা তাদের বক্তব্যে আদিবাসী সমাজের পিছিয়ে পড়া অবস্থা এবং নানা বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রের সকল স্তরে সমান অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন ১০০% সফল হবে না।

সমাবেশ থেকে আদিবাসী নেতারা তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে ৭টি প্রধান দাবি পেশ করেন। তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। তারা মনে করেন, তাদের এই পরিচয় নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। এছাড়া সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন ও আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিও বেশ জোরালোভাবে জানানো হয়। তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় ভূমিদস্যুরা জালিয়াতির মাধ্যমে আদিবাসীদের শত শত একর জমি দখল করে নিচ্ছে। এই ভূমি রক্ষা করতে না পারলে তারা নিজেদের বাস্তুচ্যুত মনে করছেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে বক্তারা বলেন, আদিবাসী শিশুরা যেন তাদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে, সে বিষয়ে সরকার যেন ১০০% কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেক সময় আদিবাসী শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত পৌঁছায়। এছাড়া তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্ষদে আদিবাসীদের জন্য অন্তত ৫% আসন সংরক্ষিত রাখার দাবি তোলা হয় যাতে তারা নিজেদের সমস্যার কথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারেন।

সমাবেশ থেকে আলফ্রেড সরেন ও চুডু সরেনসহ বিভিন্ন সময়ে নিহত আদিবাসী নেতাদের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের দাবি জানানো হয়। বক্তারা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এ দেশের আদিবাসী, কিন্তু আমরা আদিম নই।” তারা তথ্য দিয়ে জানান যে, সরকারি বিভিন্ন কার্ড যেমন—কৃষি কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখনো অনেক বৈষম্যের শিকার হন। অন্তত ৫০% আদিবাসী পরিবার এখনো সঠিক নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে না। অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা ভাতা বাড়ানো এবং উচ্চ শিক্ষায় কোটা ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।

পরিশেষে বক্তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানান যেন আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধান করে সেগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী সরকারি বরাদ্দে আদিবাসী পল্লীগুলোর উন্নয়নের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। আদিবাসী ভাই-বোনেরা অঙ্গীকার করেন যে, তাদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এই দিবসের কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর কাছে তাদের অধিকার ও অস্তিত্বের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ