চুয়াডাঙ্গায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত: সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে কঠোর হুঁশিয়ারি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মোঃ মিনারুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গা জেলার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং জনসেবা নিশ্চিত করার লক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ০৯/০৮/২০২৬ তারিখ রবিবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি সম্পন্ন হয়। সভায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি মাদক, চোরাচালান এবং কিশোর অপরাধ দমনে বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। উপস্থিত বক্তারা চুয়াডাঙ্গাকে ১০০% সন্ত্রাসমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কোনো বিকল্প নেই। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং সাধারণ মানুষ যেন দাপ্তরিক সেবা পেতে কোনো ভোগান্তির শিকার না হয়। বিশেষ করে ভূমি অফিস এবং স্বাস্থ্য বিভাগে দুর্নীতির হার ০% এ নামিয়ে আনতে তিনি কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।

অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি ও পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তিনি বলেন, মাদকের কারণে আমাদের যুবসমাজের অন্তত ৩০% থেকে ৪০% আজ ধ্বংসের মুখে। তাই মাদক কারবারিদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। এছাড়া রাস্তাঘাটের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যেন সঠিক গুণমান বজায় থাকে এবং বরাদ্দকৃত কয়েক মিলিয়ন ডলারের ($) সমপরিমাণ সরকারি অর্থের যেন কোনো অপচয় না হয়, সেদিকে নজর রাখতে প্রকৌশলীদের তাগিদ দেন তিনি।

সভায় চুয়াডাঙ্গার বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়। বক্তারা জানান, অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্য মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আগের চেয়ে আরও ৫০% বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, পবিত্র দিনগুলোতে বা সাধারণ সময়ে কোনো ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে, সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসন নিয়মিত তদারকি করবে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শহরের প্রধান মোড়গুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবও সভায় গৃহীত হয়।

কিশোর অপরাধ বা ‘গ্যাং কালচার’ প্রতিরোধে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মিনহাজ-উল-ইসলাম জানান, সম্প্রতি উঠতি বয়সের কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামাজিকভাবে মোকাবিলা করা জরুরি। তিনি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন যে, প্রতিটি এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে শতভাগ (১০০%) সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সভায় চুয়াডাঙ্গা স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বি. এম. তারিক-উজ-জামান জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। তারা জানান, জেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকে। সভায় চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর এই চার উপজেলার নির্বাহী অফিসারগণ (ইউএনও) নিজ নিজ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবেদন পেশ করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কারের প্রজেক্টগুলোতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে ২০% বেড়েছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাদের মতামত তুলে ধরেন। তারা দাবি করেন, হাসপাতালে চিকিৎসক ও ওষুধের সরবরাহ যেন নিশ্চিত থাকে এবং সাধারণ রোগীরা যেন সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার সভার সমাপ্তি টেনে বলেন, আজকের সভায় গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে চিঠি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গাবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে কাজ করে যাবে।

সার্বিকভাবে, এই সভাটি চুয়াডাঙ্গার প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। জেলার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি চুয়াডাঙ্গাকে একটি সমৃদ্ধ জেলায় পরিণত করবে বলে সাধারণ মানুষ আশা প্রকাশ করছেন। প্রশাসনের এই সক্রিয় ভূমিকা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে এবং চুয়াডাঙ্গার নিরাপত্তা সূচক আগের চেয়ে অনেক উন্নত হবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ