মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের ওপর চাপ তৈরির নতুন কৌশলী বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এখনই ইরানের সাথে কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে যাচ্ছে না। বরং তারা এখন কেবল ‘অর্ধেক দর-কষাকষি’ বা আংশিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের বর্তমান বেহাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। ট্রাম্প মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞার ফলে তেহরান বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। রোববার নিউজ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসের সাথে এক ফোনালাপে তিনি তার এই ‘ধীর নীতি’র কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অবস্থা নিয়ে ট্রাম্প বেশ কড়া মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, ইরানে এখন বিশাল মূল্যস্ফীতি চলছে এবং দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই মূল্যস্ফীতির হার ৩০% থেকে ৫০% ছাড়িয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ট্রাম্প সরাসরি বলেন, “আমরা শুধু ইরানকে দেখছি, তাদের বিশাল মূল্যস্ফীতি রয়েছে এবং তাদের হাতে এখন কোনো টাকা নেই।” মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইরানি রিয়ালের মান কয়েক বিলিয়ন ডলারের ($) সমপরিমাণ কমে গেছে। এই চরম আর্থিক সংকটই ইরানকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে বলে ট্রাম্প আশা করছেন।
ট্রাম্পের এই বড় দাবির মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ। এই প্রণালির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও জলপথে মার্কিন বাহিনীর কড়া নজরদারি ইরানের তেল রপ্তানিকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই অবরোধের কারণেই ইরান আজ “খুবই খারাপ অবস্থায়” পড়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকায় ইরান প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) রাজস্ব হারাচ্ছে, যা তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে এই কৌশলের পেছনের গূঢ় কারণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরাসরি যুদ্ধ বা সংঘাত চলার সময় অনেক দেশ সামরিক উত্তেজনার আড়ালে তাদের অর্থনৈতিক মন্দার খবর ঢেকে রাখতে পারে। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু বড় ধরনের কোনো হামলা বা সংঘর্ষ হচ্ছে না, তাই তেহরানকে এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এখন তাদের সামনে যুদ্ধের চেয়ে নিজের দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষুধার জ্বালা মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সংকটের কোনো সহজ বা জাদুকরী সমাধান এই মুহূর্তে ইরানের হাতে নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা করছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তির আলোচনা চলছিল। কিন্তু তেহরান এখনো এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে বেশ গড়িমসি করছে। এই দ্বিধা বা দেরি নিয়ে ট্রাম্প কোনো প্রকার হতাশা প্রকাশ করেননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে পুরো বিষয়টি তুলনা করেছেন দাবা খেলার সাথে। ট্রাম্প বলেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে। সব সময় ঠিক হয়েই যায়। এটা অনেকটা দাবা খেলার মতো।” তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি মনে করছেন সময়ের সাথে সাথে ইরান নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়বে এবং এক সময় নিজেদের প্রয়োজনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে।
অন্যদিকে, ইরানও একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর আলোচনার টেবিলে বসার আগে বেশ কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ওমান-ইরান চুক্তি নিয়ে সামনে এগোতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানকে হুমকি দেওয়া বা অপমান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, ইরানের মিত্র দেশগুলোর ওপর চলমান সব সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে তারা। এছাড়া তাদের বড় দাবি হলো, বর্তমান নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নিতে হবে এবং বিদেশের ব্যাংকে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের ($) ইরানি তহবিল অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই লড়াই এখন কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ধীর নীতি’ এবং অন্যদিকে ইরানের দেওয়া কঠোর শর্ত—এই দুইয়ের চাপে পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠছে। তবে ট্রাম্পের এই “অর্ধেক দর-কষাকষি” নীতি কতটুকু কার্যকর হয়, তা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে। আগামী কয়েক মাসে তেলের বাজার এবং মুদ্রাস্ফীতির গতিপ্রকৃতিই নির্ধারণ করবে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং তারা আদৌ মার্কিন শর্তে রাজি হবে কিনা।
















