বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ তিন যুগ বা প্রায় ৩৬ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের রোমাঞ্চ ফিরে আসছে। সবশেষ ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। সংখ্যার বিচারে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় ১০০% নিশ্চিত হলেও লড়াইয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। এক সময়ের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও শহীদ জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহচর এখন মির্জা ফখরুলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে তাকে প্রার্থী ঘোষণা করায় রাজনৈতিক মহলে এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির শক্তি আকাশচুম্বী। দলটির কাছে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৬৬% এর বেশি আসন রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত ও এর সহযোগী ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা মাত্র ৯০ জন। এই অসম লড়াইয়ে অলি আহমদের জয়ের সম্ভাবনা গাণিতিক হিসেবে শূন্য হলেও জামায়াত জোট এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত নিজেদের গায়ে থাকা পুরনো তকমা মুছতে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে এনে বড় চাল চেলেছে। বিশেষ করে অলি আহমদ ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের একজন বীর বিক্রম খেতাবধারী যোদ্ধা, যাকে সম্মান জানাতে বাধ্য সব পক্ষই।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জামায়াত ছাড়াও এনসিপি, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একমত হয়ে অলি আহমদের নাম প্রস্তাব করেন। জামায়াতের এই ‘কর্নেল অলি কার্ড’ খেলার পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত বিএনপি গত নির্বাচনে জামায়াতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিল। সেই চাপের পাল্টা জবাব দিতেই জামায়াত এখন একজন তুখোড় মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামে এক সমাবেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, অলি আহমদই প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, যা নিয়ে বিএনপির মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। শহীদ জিয়ার হাত ধরে আসা এই নেতা দীর্ঘ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ সালে যোগাযোগমন্ত্রী এবং ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জ্বালানি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০০৬ সালে অভিমানে তিনি বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছর বিএনপির সাথে কখনো মিত্র, আবার কখনো দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে বিএনপির কাছে ১৪টি আসন দাবি করেছিলেন তিনি। কিন্তু বিএনপি তাতে সাড়া না দেওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন।
বিএনপি ও জামায়াতের এই লড়াই এখন কেবল পদের লড়াই নয়, বরং আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। বিএনপি চাচ্ছে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করে দল ও সরকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে। অন্যদিকে, জামায়াত জোট প্রমাণ করতে চায় তারা একটি কার্যকর ও সভ্য বিরোধী দল। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের মনে করেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করবে। তাদের মতে, সংসদে কেবল নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা নয়, বরং প্রতিটি আইনি প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করাই তাদের লক্ষ্য। এ কারণেই তারা ৯০ জন সদস্যের সমর্থন নিয়ে ভোটাভুটির এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
আগামী ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে এই ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বাইরে ভোট দিতে পারেন না, তাই ফলাফলের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই। তবে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় থাকলেও অলি আহমদ শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন দুর্নীতিমুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি দেশের অভিভাবক হওয়ার লড়াই করছি।’ নির্বাচন কমিশনও ইতিমধ্যে ভোটের সব সরঞ্জাম ও ব্যালট পেপার প্রস্তুতির কাজ ৯৫% সম্পন্ন করেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। মির্জা ফখরুল বঙ্গভবনে গেলে বিএনপির মহাসচিব পদে কে বসবেন, তা নিয়ে যেমন দলে উত্তেজনা আছে, তেমনি অলি আহমদের এই লড়াই বিরোধী শিবিরের ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করবে কিনা তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ভোটের লড়াই যেভাবেই হোক না কেন, দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কোনো ব্যক্তিত্বই যেন রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন হন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে কে হচ্ছেন দেশের ২১তম অভিভাবক।
















