বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যেই তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, তার অংশ হিসেবে গত শনিবার মির্জা ফখরুল তার লিখিত সম্মতিসূচক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক এখন দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবকের আসনে বসতে চলেছেন।
এদিকে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট আলাদা প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে তাদের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। আজ রোববার মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিরোধী জোটের দাবি, তারা দেশে একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। বর্তমানে সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৬৬% এর বেশি আসন রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ সময় পর সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ব্যালট পেপার ছাপাতে হচ্ছে। কমিশন ইতিমধ্যে ৩৪৯ জন ভোটারের একটি তালিকা চূড়ান্ত করেছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পার হওয়ার পরেই চূড়ান্ত লড়াইয়ের চিত্র স্পষ্ট হবে।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এখন রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন? ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০১৬ সালে পূর্ণ মহাসচিব মনোনীত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিকূল সময়ে তিনি অন্তত ৬ বার কারাগারে গিয়েছেন। তার জায়গায় নতুন কে আসবেন, তা নিয়ে দলে জোর গুঞ্জন চলছে। বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। দলের একটি বড় অংশ মনে করছে, আপাতত ১০০% ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব চূড়ান্ত করা হবে।
বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াত নেতারা জানান, তারা দেশের রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ধীরগতির ওপর কিছুটা নাখোশ। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি চাইলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দেওয়া যেত, কিন্তু তারা সংস্কারের পথে না হেঁটে একলা চলো নীতি গ্রহণ করেছে। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান মনে করেন, রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে গণতন্ত্রের শ্রী বৃদ্ধি পায়। যদিও গাণিতিক হিসেবে অলি আহমদের জেতার সম্ভাবনা ০% এর কাছাকাছি, তবুও ৯৫ জন বিরোধী সদস্যের সক্রিয় উপস্থিতি জানান দিতেই তারা এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর এটি হবে দ্বিতীয়বারের মতো সরাসরি ভোটাভুটির ঘটনা। এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপির আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মধ্যে ভোট যুদ্ধ হয়েছিল। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না, তাই মির্জা ফখরুলের জয় পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অলি আহমদের মতো একজন বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধাকে প্রার্থী করে জামায়াত জোট নিজেদের সক্ষমতার একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে পেরেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ডামাডোলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তুতি প্রায় ১০০% সম্পন্ন করেছে। আজ সকালেই বিএনপির পক্ষে নুরুল ইসলাম মনি এবং রুহুল কবির রিজভী দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩টি মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন। মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর গত ২৪ জুলাই থেকে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য রয়েছে। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে নয়, বরং প্রকাশ্য সইয়ের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হবে।
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি এখন মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাত্রা এবং বিএনপির নতুন মহাসচিব নির্বাচনের সমীকরণ নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের রাজপথের লড়াকু এই নেতাকে রাষ্ট্রপতির আসনে দেখতে পাওয়া তৃণমূল কর্মীদের কাছে এক বড় পাওনা। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের অলি আহমদকে প্রার্থী করার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের রাজনীতিতে জামায়াত ও এলডিপি একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে চায়। এখন কেবল ২০ আগস্টের আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা, যখন বাংলাদেশ পাবে তার নতুন রাষ্ট্রপতি।
















