চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে এখন যেন আগুনের হলকা বইছে। মৃদু তাপপ্রবাহের কারণে জনজীবন এমনিতেই ওষ্ঠাগত, তার ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা এতটাই বেশি যে, সাধারণ মানুষ এখন চরম ধৈর্যের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিশেষ করে আমন মৌসুমের এই সময়ে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকটে জেলার অর্থনীতি ও কৃষি খাতে এক অন্ধকার ছায়া নেমে এসেছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, দিনে ও রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। কোনো কোনো এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এখন আমন ধানের ভরা মৌসুম, যেখানে ক্ষেতে নিয়মিত পানি দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্পগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষক মাসুদ রানা ক্ষোভের সাথে জানান, “এই প্রচণ্ড গরমে জমিতে পানি না দিলে ধান গাছ পুড়ে খাক হয়ে যাবে। আমরা ১০০% সেচের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্প চালাতে পারছি না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে ফসল বুনেছি, তা নিয়ে এখন ঘোর দুশ্চিন্তায় আছি।”
শুধু নাচোল নয়, শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলেও একই হাহাকার। কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগ চরাঞ্চলে সব সময় অবহেলা করে। অথচ এই এলাকাগুলো থেকেই জেলার সিংহভাগ সবজি ও ধান আসে। নিয়মিত সেচ দিতে না পারলে ফসলের উৎপাদন ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় সেচ পাম্পই এখন কৃষকের একমাত্র ভরসা, কিন্তু লোডশেডিং সেই ভরসায় গুড়েবালি ঢেলে দিচ্ছে।
শহরাঞ্চলের পরিস্থিতিও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বাবু বলেন, “সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ যায়। একদিকে অসহ্য গরম, অন্যদিকে ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস নষ্ট হওয়ার ভয়। এভাবে একটা শহর চলতে পারে না।” সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রুটিন এখন বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। রাতেও ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না মানুষ, যার ফলে কর্মক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে কাপড়ের দোকান এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। ক্লাব সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুল আজিম জানান, “দোকানে এসি বা ফ্যান না চললে এই গরমে কোনো ক্রেতা ৫ মিনিটও থাকতে চান না। দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না, ফলে বেচাকেনা প্রায় ৫০% কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে দোকানের ভাড়া আর কর্মচারীদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।” অনেক ব্যবসায়ী ছোট ছোট জেনারেটর ব্যবহার করছেন, তবে ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে তাতে খরচ বাড়ছে কয়েক গুণ।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ফারাক থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোহামিনুর রহমান জানান, জেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্রিড থেকে তারা সরবরাহ পাচ্ছেন মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩৩% বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই ১০ থেকে ১৫ মেগাওয়াট ঘাটতি মেলাতে গিয়েই পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অবস্থা আরও নাজুক। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান জানান, গ্রামাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় ৩০% থেকে ৪০% কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। আমন চাষের কারণে গ্রামের দিকে লোড এখন অনেক বেশি। সরবরাহ না বাড়লে এই সংকট সহজে কাটবে না। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, সরকারিভাবে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নিলে কৃষি ও ব্যবসা উভয় খাতেই ধস নামবে। জেলার লাখ লাখ মানুষের প্রাণের দাবি, দ্রুত যেন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয় এবং তাপপ্রবাহের এই কঠিন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়।
















