তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায় ভারত: সংসদীয় কমিটির বিশেষ সুপারিশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দেশটির সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে জোরালো ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। কমিটি মনে করে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ একটি দেশ। তাই সব তিক্ততা ও দ্বিধা কাটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকা এখন নয়াদিল্লির জন্য জরুরি। গত ২০২৪ সালের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ার ওপর জোর দিয়েছে এই কমিটি।

কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন এই সংসদীয় কমিটি গত বৃহস্পতিবার লোকসভায় একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত। প্রতিবেদনে গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কমিটি মনে করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকারের অংশগ্রহণ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন এই সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে দুই দেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে নিয়মিত সফরের আয়োজন করা দরকার।

এই প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কমিটি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছিল। জবাবে ভারত সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এসেছে, সেটি বর্তমানে দেশটির ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ খতিয়ে দেখছে। তবে ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। মানবিক কারণে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হলেও তাঁর বর্তমান অবস্থানকে ভারত ‘সভ্যতার চেতনা’ হিসেবেই দেখছে।

কমিটি বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদলের চীন সফরকে বেইজিংয়ের গভীর কূটনৈতিক চাল হিসেবে দেখছে দিল্লি। অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চীনের সক্রিয়তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির যেকোনো তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য নরেন্দ্র মোদি সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারত সরকারও কমিটিকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে ভারত প্রতিদিন গড়ে ১,৫০০টি ভিসা দিচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৮০% শতাংশই হচ্ছে চিকিৎসার জন্য দেওয়া ‘মেডিক্যাল ভিসা’। কমিটি মনে করে, ভিসা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হবে, যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। দ্রুত সময়ের মধ্যে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা আগের মতো সহজ করার সুপারিশ করেছে তারা। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, ভিসা ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।

সীমান্ত সুরক্ষা নিয়েও প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় কমিটি বলেছে, যেসব সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কমিটির মতে, দুর্গম এলাকায় স্মার্ট সেন্সর, লেজার ওয়াল এবং ভাসমান বেড়া দেওয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ভারতবিরোধী অপপ্রচার বন্ধেও ভারতকে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। কমিটি আশা করছে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং অমীমাংসিত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ