মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ৫ দিনের একটি ছোট বিরতির পর বুধবার রাতে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় ইরানে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে ইরানও চুপ করে বসে থাকেনি। তারা পাল্টা জবাবে কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শুধু এই দেশগুলোই নয়, একই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন ও সিরিয়াতেও নতুন করে ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল এখন ভয়াবহ যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে এবং বড় দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি হুমকি এই সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলায় ইরানের বেশ বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানিয়েছে, জানজান প্রদেশে তাদের ৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া কেশম দ্বীপে ৩ জন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। বুশেহর, আহভাজ এবং বন্দর আব্বাসের মতো বড় শহরগুলোতেও একের পর এক বোমা পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তারা ইরানকে কঠিন শাস্তি দেবেন। হামলার পর ট্রাম্পের সেই কথার প্রতিফলন দেখা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ৫০,০০০ এর বেশি সেনা মোতায়েন করে রেখেছে।
ইরানের পাল্টা হামলার খবরও বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ইরান দাবি করেছে যে, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনটি অত্যন্ত আধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া আরও তিনটি বিমানের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। পাশাপাশি কুয়েতের আলী-আল-সালেম ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। এতে ড্রোন রাখার দুটি হ্যাঙ্গার ও একটি বড় জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানি হামলায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে কাজ করা এক শ্রমিক মারা গেছেন। যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলে এখন ১০০% অস্থিরতা বিরাজ করছে।
এদিকে গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতিও এখন চরম পর্যায়ে। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহকে দমানোর নাম করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলছে। উপকূলীয় টায়ার শহর থেকে শুরু করে আল-মানসুরি ও মাজদাল জৌন গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ। অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতা থামার কোনো লক্ষণ নেই। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩,৩৪১ জনে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও অনেক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সিরিয়ার কুনেইতরা এলাকাতেও ইসরায়েল নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার ফলে উত্তেজনা আরও কয়েক গুণ বেড়েছে।
এই যুদ্ধের আঁচ এবার সৌদি আরবেও গিয়ে লেগেছে। বুধবার প্রথমবারের মতো আমেরিকার সাথে জোট বেঁধে ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে সৌদি সামরিক বাহিনী। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও এখন সৌদি আরবের ওপর হামলা করার সুযোগ খুঁজছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি মিসরের একটি বন্দরে দুটি জাহাজ আক্রমণের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্বের তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে যায়। এই উত্তেজনা চলতে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহন এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অথচ মাত্র কয়েক দিন আগে মনে হচ্ছিল পরিস্থিতি হয়তো আলোচনার দিকে যাবে। ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন যে শান্তি আলোচনা বেশ ভালো এগোচ্ছে। কিন্তু বুধবার রাতের হামলা সব আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। গবেষক ট্রিটা পারসি মনে করেন, ট্রাম্প এখন কেবল প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, যতদিন মার্কিন হুমকি থাকবে তারা নিজেদের রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাবে। দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে শান্তির সব প্রচেষ্টাই এখন ব্যর্থ হতে চলেছে। জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক এখন কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মুখপাত্র ফারহান হক জানিয়েছেন, গুতেরেস মনে করেন দ্রুত আলোচনার টেবিলে না ফিরলে এই সংঘাত পুরো বিশ্বকে গ্রাস করবে। বর্তমানে পাকিস্তান ও ওমান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। ইরান চায় হরমুজ প্রণালিতে তাদের নির্ধারণ করা পথে জাহাজ চলুক, কিন্তু আমেরিকা তা মানতে রাজি নয়। এই ছোট একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে বড় যুদ্ধ বেধে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে ১% জাহাজও এখন শান্তিতে চলতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে প্রতিটি দেশে।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন নেভানোর বদলে যেন আরও উসকে দেওয়া হচ্ছে। দুই পক্ষই ভাবছে আরও কয়েকটা শক্তিশালী হামলা চালালে তারা হয়তো আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু মাঝখান থেকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। ট্রাম্পের কঠিন শাস্তি দেওয়ার হুমকি এবং ইরানের পাল্টা হামলার জেদ পরিস্থিতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে কবে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হবে। তবে বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শান্তি আসতে এখনো অনেক পথ বাকি।
















