আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১৩ দিন এক প্রকার যুদ্ধবিরতি চলার পর বুধবার ভোরে আবারও বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ)-এর একাধিক ঘাঁটিতে একযোগে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন যোদ্ধার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৩০ জনেরও বেশি গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পরেই জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আজ ভোরে চালানো এই হামলায় সৌদি আরবের সরাসরি অংশগ্রহণ সবাইকে অবাক করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম সৌদি আরব প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিল। যুক্তরাষ্ট্র ও রিয়াদ দাবি করছে, গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো যেসব ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তার সমুচিত জবাব দিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইরাকের বাগদাদ, বসরা, কিরকুক এবং কারবালাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে পিএমএফ-এর প্রায় ১০ থেকে ১২টি ঘাঁটিতে বৃষ্টির মতো বোমা বর্ষণ করা হয়। এতে গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতার প্রায় ১৫% থেকে ২০% ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরাকে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই ইরান তার জবাব দেয়। জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের বেশিরভাগ আক্রমণই প্রতিহত করেছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া অন্তত ৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। তবে এই ঘটনার পর জর্ডানে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪,০০০ (চার হাজার) মার্কিন সেনার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সেনারা যাতে কোনো গোপন তথ্য বা ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করতে না পারে, সেজন্য তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর ১০০% কড়াকড়ি আরোপের চিন্তা করছে ওয়াশিংটন।
এই ঘটনার পরপরই ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আজ ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, জর্ডানে হামলার জন্য ইরানকে অনেক ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে। ট্রাম্পের মতে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তিনি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, ইরাকি সরকারের সাথে পূর্ণ সমন্বয় করেই তারা এই হামলা চালিয়েছেন এবং প্রয়োজনে তারা আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না।
এদিকে, ইরাকের ভেতরে এমন ভয়াবহ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ইরাকের ভূখণ্ডকে অন্য দেশের সাথে বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ইরাকের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। অন্যদিকে, তেহরান থেকেও কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখছে এবং এই উত্তেজনার দায় সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখন কেবল স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী অন্তত ৩টি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওমান সরকার হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি প্রস্তাব দিলেও ইরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালির এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি এই সংঘাত আরও ১০% বৃদ্ধি পায়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ দুই দেশকেই গত মাসে সই হওয়া ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি সমঝোতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। যেভাবে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনো সমঝোতা স্মারকই (MoU) কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে না। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলের চেয়ে এখন সামরিক যুদ্ধক্ষেত্রই বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের এই যৌথ আক্রমণ এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরো অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের একটাই ভয়, এই লড়াই যদি আরও বড় আকার ধারণ করে, তবে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়। সংঘাত যদি না থামে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগিয়ে যাবে যা কারোরই কাম্য নয়।
















